এস.এম লুৎফুর কবির, কক্সবাজার ব্যুরো : কক্সবাজারের মহেশখালীতে পাহাড় কেটে শাপলাপুর–কালারমারছড়া সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার অংশের কাজ বন্ধ রাখার হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের কারণে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা আপিল বিভাগের আদেশে কেটে গেছে। ফলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সড়কটির নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে প্রায় ২২ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার ২৪০ টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি। আগামী ২০২৭ সালের ৯ জানুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা।বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সড়কটির একটি অংশ সংরক্ষিত বনভূমির মধ্য দিয়ে গেছে কি না এবং বন ও পরিবেশসংক্রান্ত বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর ভিত্তিতে গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট রিট পিটিশন নম্বর ৯২৭৫/২০২৬-এ রুল জারি করে সড়কের প্রায় ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার অংশের নির্মাণকাজ দুই মাসের জন্য বন্ধ রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেন।প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, এটি নতুন কোনো সড়ক করিডোর নির্মাণ নয়; বিদ্যমান সড়কপথের উন্নয়ন প্রকল্প।
এ-সংক্রান্ত অ্যালাইনমেন্ট ম্যাপ, প্রকল্পের নথিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।এদিকে বন বিভাগের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্যেও সংরক্ষিত এলাকা ও বনভূমির বিভিন্ন রেকর্ড রয়েছে। তবে সেখানে কালারমারছড়া–জে এম ঘাট সড়কের অ্যালাইনমেন্ট কিংবা মহেশখালী পাহাড় মৌজাকে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার তথ্য পাওয়া যায় না। বন বিভাগের রেকর্ডে কাছাকাছি গেজেটভুক্ত এলাকা হিসেবে চকরিয়া উপজেলার ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের তথ্য রয়েছে।হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে ৩২১৪/২০২৬ নম্বর সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল করা হয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের ১ নম্বর আদালতে এ বিষয়ে শুনানি হয়। আদালতের কার্যতালিকার তথ্য অনুযায়ী, স্থগিতাদেশসংক্রান্ত বিষয়টি ‘ডিসপোসড অব স্টে’ করা হয়েছে। এর ফলে প্রযোজ্য আইন, পরিবেশগত শর্ত, অনুমোদিত প্রকল্পের নথি এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সড়ক প্রকল্পের এই আইনি জটিলতা নিরসনে এলজিইডি কক্সবাজারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র উপস্থাপন ও প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে জেলা এলজিইডির উদ্যোগ ও সমন্বিত প্রচেষ্টাই বর্তমান অগ্রগতির অন্যতম কারণ।এলজিইডি কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসানাত মহিউদ্দিন বলেন, মহেশখালীর উত্তরাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ওই এলাকার মানুষের যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সুবিধা হবে। আপিল বিভাগের আদেশের পর আদালতের নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়কটির উন্নয়নকাজ শেষ হলে কালারমারছড়া ও জে এম ঘাটের মধ্যে যাতায়াতের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার থেকে কমে সাড়ে চার কিলোমিটারে নেমে আসতে পারে। এতে কালারমারছড়া, শাপলাপুরসহ উত্তর মহেশখালীর মানুষের বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাতায়াত সহজ হবে।এ ছাড়া সড়কটি মাতারবাড়ী অঞ্চলের সঙ্গে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বড় প্রকল্প চলমান থাকায় এই সড়ক ভবিষ্যতে স্থানীয় যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা।