“আমার শাশুড়ি নাই, আমার জামাই নাই, আমার মেয়ে নাই, আমার ছোট্ট নাতিটাও নাই রে আল্লাহ! তুমি আমারে কার কাছে রাইখা গেলা। আমি এহন কার মুখ দেইখা বাঁচুম?”
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বামী, মেয়ে, শাশুড়ি ও নাতির লাশের দিকে তাকিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন চায়না বেগম। কিছুক্ষণ পরপরই মরদেহগুলোর কাছে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। স্বজনরা তাকে ধরে রাখছিলেন। চারপাশে তখন শুধু কান্না আর আহাজারি।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস সড়কের গন্দ্রপা এলাকায় বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের চারজনসহ সাতজন নিহত হন। একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে চায়না বেগমের পরিবার।
নিহত চারজন হলেন—চায়না বেগমের স্বামী রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫০), তার বৃদ্ধ মা রাশিদা বেগম (৭০), মেয়ে মর্জিনা (২৫) এবং পাঁচ বছরের নাতি মিনাল। নিহত অপর তিনজন হলেন জামালপুরের নান্দিনা এলাকার অটোরিকশাচালক সুজন সরকার (৪৫), যাত্রী আকরাম মিয়া (৫১) ও তার স্ত্রী মমতাজ বেগম (৪৫)।
সকালে একসঙ্গে বের হয়েছিলেন, ফিরলেন চারটি লাশ হয়ে
স্বজনরা জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে জীবিকার তাগিদে গাজীপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন মোফাজ্জল হোসেন লেবু। সংসারের স্বচ্ছলতার জন্য জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন কর্মস্থলে। এবার গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন বৃদ্ধ মা রাশিদা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরে ফেরার জন্য।
শুক্রবার সকালে মা, মেয়ে ও নাতিকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন মোফাজ্জল। পরিবারের সদস্যরা তখনও জানতেন না, এটিই হবে তাদের শেষ যাত্রা।
চায়না বেগম বলেন, “সকালেও সবাই একসঙ্গে ঘর থেকে বের হইছে। গাজীপুর গিয়া ফোন দেওয়ার কথা আছিল। আর এহন ফোন আইলো থানা থাইকা। আমি এহন কার মুখ দেইখা বাঁচুম।”
‘আমাগো সব শেষ হইয়া গেছে’
মোফাজ্জলের ভাতিজা রোকন বলেন, “নান্দিনা থেকে মা, মেয়ে আর নাতিকে নিয়ে গাজীপুরের দিকে রওনা দিছিল। দুপুরের পরেই ফোন আসে—পরিবারের সবাই বাসের চাপায় মারা গেছে। এখন আমরা কেমনে বাঁচব? আমাগো সব শেষ হইয়া গেছে। আমরা কি বিচার পামু? আমরা কার কাছে বিচার দিমু?” কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন রোকন।
মোফাজ্জল ও চায়না দম্পতির এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তাদের এক মেয়ে মর্জিনা এবং পাঁচ বছরের নাতি মিনালও নিহত হয়েছে এই দুর্ঘটনায়। নিহতরা জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনা দড়ি হামিদপুর গ্রামের বাসিন্দা।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজনদের সারিবদ্ধ মরদেহ দেখে বারবার ছুটে যাচ্ছিলেন চায়না বেগম। পাশে থেকে তাকে সামলানোর চেষ্টা করছিলেন নিহত মোফাজ্জলের ছোট ভাই মোবারক হোসেন। কিন্তু স্বজনদের সান্ত্বনা কোনোভাবেই থামাতে পারছিল না তার কান্না।
একটি দুর্ঘটনা, চারটি কবর
দুর্ঘটনার পর একে একে চারটি মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি নান্দিনা দড়ি হামিদপুরের উদ্দেশে রওনা হন স্বজনরা। লাশবাহী গাড়ি যখন হাসপাতাল চত্বর ছাড়ে, তখনও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ছিল চারপাশের পরিবেশ। সকালে যে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে গাজীপুরের পথে বের হয়েছিলেন, দুপুরের পর তাদের চারজন ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু চারটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, এক নিমিষে ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সংসার ও ভবিষ্যৎ। স্বামী, শাশুড়ি, মেয়ে ও নাতিকে হারিয়ে চায়না বেগমের সামনে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন—“আমি এহন কার মুখ দেইখা বাঁচুম?”