খায়রুল আলম সুমন : বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আখ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। চিনি ও গুড় উৎপাদনের পাশাপাশি সরাসরি চিবিয়ে খাওয়া, আখের রস, বিভিন্ন খাদ্যপণ্য এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আখের ব্যবহার রয়েছে। দেশের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি আখ চাষ হলেও মাটি, জলবায়ু ও বাজারব্যবস্থার কারণে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ঐতিহ্যগতভাবে আখ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর ও কুষ্টিয়ায় আখের আবাদ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ফরিদপুর, ঢাকা ও জামালপুরেও আখ চাষ ভালো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলেও আখ চাষের বিস্তার ঘটছে। ২০২৬ সালের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলে আখের উৎপাদন বাড়ছে। বিশেষ করে চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, বাঁশখালী, রাঙ্গুনিয়া ও সন্দ্বীপে আখ চাষের প্রবণতা রয়েছে। ২০২১ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬৬ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৯ হাজার ৬৭ মেট্রিক টন আখ উৎপাদিত হলেও ২০২৬ সালে আবাদ বেড়ে ৪৪০ হেক্টরে এবং উৎপাদন বেড়ে প্রায় ২৫ হাজার ৯২ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।
উত্তরাঞ্চলে আখের ঐতিহ্য
রাজশাহী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আখ উৎপাদন এলাকা। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ব্যাপকভাবে আখ চাষ হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, চিনিকলে আখ সরবরাহ ও অর্থপ্রাপ্তিতে বিলম্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে আখের আবাদ কমেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ অঞ্চলে আখের আবাদ ছিল ৪০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টরে নেমেছে।
অন্যদিকে চিবিয়ে খাওয়ার আখের জন্য গাইবান্ধা ও পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িরও আলাদা পরিচিতি রয়েছে। খাগড়াছড়িতে আখ চাষকে ঘিরে বড় ধরনের স্থানীয় বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। পুরোনো কৃষি তথ্যের ভিত্তিতে জেলায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ এবং বছরে ২০ হাজার টনের বেশি উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যায়।
কৃষকের জন্য আখ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আখ দীর্ঘমেয়াদি ফসল হলেও সঠিক জাত, আধুনিক প্রযুক্তি ও ভালো বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি কৃষকের জন্য লাভজনক হতে পারে। বিশেষ করে চিবিয়ে খাওয়ার আখ সরাসরি বাজারে বিক্রি করা যায় বলে অনেক কৃষক চিনিকলের ওপর নির্ভর না করেও আয় করতে পারেন।
২০২৬ সালের চট্টগ্রামের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নদীতীরবর্তী উর্বর জমিতে আখ চাষ করে অনেক কৃষক ভালো দাম পাচ্ছেন। একজন কৃষক প্রতি কানিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা উৎপাদন ব্যয়ের বিপরীতে ক্ষেত থেকেই ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রির কথা জানিয়েছেন।
আখের আরেকটি সুবিধা হলো এর সঙ্গে সাথী ফসল চাষের সুযোগ। কৃষি গবেষণায় আখের সঙ্গে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ডাল, তেলবীজ ও মসলা জাতীয় ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের তথ্য রয়েছে। এতে একই জমি থেকে কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
আখ শুধু চিনি বা গুড়ের জন্য নয়
আখের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার চিনি ও গুড় উৎপাদন। তবে এর গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। আখের রস সরাসরি পান করা যায়, আবার বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়। আখের ছোবড়া বা বাগাস চিনিকল ও বিভিন্ন শিল্পে জ্বালানি এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহারযোগ্য।
আধুনিক গবেষণায় আখকে বায়োফুয়েল বা বায়োইথানল উৎপাদনের সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে আখের বিস্তৃত চাষাবাদ থাকায় ভবিষ্যতে আখভিত্তিক বায়োইথানল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে আখের অবদান
আখের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু কৃষকের আয়েই সীমাবদ্ধ নয়। মাঠ থেকে আখ সংগ্রহ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, গুড় তৈরি, চিনি উৎপাদন, মাড়াই, শ্রমিকের কর্মসংস্থান—সব মিলিয়ে আখকে কেন্দ্র করে একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশে চিনির চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন কম। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, উন্নত জাত ব্যবহার, সঠিক সময়ে আখ কাটা, দ্রুত চিনিকলে পৌঁছানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আখ ও চিনি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক বক্তব্যেও আখ উৎপাদন ও মাড়াই—উভয় পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে আখ চাষকে আরও লাভজনক করা সম্ভব বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়।
সামনে বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু আখ চাষের জন্য উপযোগী। উন্নত জাত, মানসম্মত বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, সেচ ও পানি নিষ্কাশনের উন্নতি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং চিনিকলগুলোর দক্ষতা বাড়ানো গেলে আখের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করলে প্রতি হেক্টরে ১৩৫-১৩৬ টন পর্যন্ত আখ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন পরিবেশের উপযোগী উচ্চফলনশীল, বন্যা, জলাবদ্ধতা, খরা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু আখের জাত উদ্ভাবন করেছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকটও রয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, বাজারদরের অনিশ্চয়তা, চিনিকলে আখ সরবরাহে জটিলতা এবং কৃষকের সময়মতো অর্থপ্রাপ্তির সমস্যা দূর করতে হবে। রাজশাহী অঞ্চলে গত এক দশকে আবাদ কমে যাওয়ার ঘটনা এ বিষয়গুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।
কৃষি অর্থনীতিতে নতুন শক্তি হতে পারে আখ
বাংলাদেশের কৃষিতে আখকে শুধু চিনি উৎপাদনের ফসল হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। কৃষকের লাভ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, গুড় ও খাদ্যশিল্প, চিনিকল, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ এবং ভবিষ্যতে বায়োইথানলের মতো নতুন শিল্প—সব মিলিয়ে আখ একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক ফসল।
সঠিক পরিকল্পনা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আখ আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় চিনি ও গুড় উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও আখ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।
তাই মাঠের সবুজ আখ শুধু কৃষকের ঘরে মিষ্টি হাসি নয়—সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি হতে পারে দেশের কৃষি অর্থনীতির আরও একটি শক্তিশালী ভিত্তি।