গুলশান-বনানী-বারিধারার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাড়িতে সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল করা হয়নি: মন্ত্রী

আপলোড সময় : ০৮-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৮-১০-২০২৬
দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন ব্যবস্থাকে সমন্বিত একটি পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসতে বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থাপত্য, কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক পরিকল্পনা সমন্বিত করে অনুমোদন দেওয়া এবং নির্মাণকাজ শেষে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট প্রদানের ব্যবস্থাকেও জোরদার করা হচ্ছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এসব তথ্য জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, নগর ও আবাসন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিত রূপ দিতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু কাজে হাত দেওয়া হয়েছে। আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল এবং ইলেক্ট্রো প্ল্যানিং—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা এখন চলছে।

মন্ত্রী বলেন, ভবনের নকশা অনুমোদন পাওয়ার পর নির্মাণকাজে সেই অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। এ জন্য অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় ভবনটি অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিজাইনারদের মাধ্যমে প্রত্যয়নের ব্যবস্থা করা হবে।

জাকারিয়া তাহের জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী গত সাত মাস ধরে নগর উন্নয়ন ও আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জানান, আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইউডিডি) প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় ধাপে ধাপে সারা দেশে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের কাজ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে মেট্রোপলিটন শহরগুলো। পরে বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকার জন্য বাস্তবভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, প্রতিটি এলাকার প্রয়োজন ও সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে কোথায় কোন ধরনের স্থাপনা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা কিংবা অন্যান্য ব্যবহার থাকবে—তা ঠিক করে জোনিং করা হবে।

মন্ত্রীর ভাষায়, মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো অনেকটা একটি লক্ষ্যবস্তুতে চারটি তীর ছোড়ার মতো, যার কোনো একটি হয়তো লক্ষ্যে লাগতে পারে। তবে পরিকল্পিত উন্নয়নে এভাবে এগোনোর সুযোগ নেই; কাজ করতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতেই। সে কারণেই ইউডিডিকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং এ বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চলছে।

তিনি আরও বলেন, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দেশের সর্বশেষ জনশুমারি হয়েছে অনেক আগে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি, জনসংখ্যা, বসতি, আবাসন ও নগরায়ণের প্রকৃত চিত্র জানার জন্য নতুন করে একটি উপযুক্ত শুমারি করা দরকার। ওই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।

ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, রাজধানীর ধানমন্ডিসহ রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ভবনের নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে রাজউকের মাধ্যমে। তবে এর বাইরে অনেক এলাকায় ভবন নির্মিত হয়েছে অনুমোদিত পরিকল্পনা ছাড়াই। এ ধরনের ভবন চিহ্নিত করার কাজ চলমান রয়েছে।

রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকার পরিবেশ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। জাকারিয়া তাহের আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ছয়বার বৈঠক করেছেন।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারায় বাড়িঘরের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি। এগুলোর মধ্যে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাড়িতে নির্মাণের সময় যে সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল থাকার কথা ছিল, তা তৈরি করা হয়নি। একইভাবে অনেক নামিদামি ডেভেলপার ভবন নির্মাণ করলেও বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপির ব্যবস্থা রাখেননি।

তিনি জানান, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার পাশাপাশি গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা এসব বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

জাকারিয়া তাহের বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত এলাকা হলো গুলশান ও বারিধারার মতো এলাকাগুলো। এসব এলাকার লেকের পানি ও পরিবেশ ঠিক রাখা না গেলে সারা দেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, নগর উন্নয়নে সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ আছে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনাও মিলছে। দেশের কল্যাণে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর কোনো পরামর্শ পাওয়া গেলে জনগণ থেকে নির্বাচিত সরকার তা গ্রহণ করতে আগ্রহী। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

নগর ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে নতুন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠনের কথাও তুলে ধরেন জাকারিয়া তাহের। তিনি জানান, গত সাত মাসে রাজউকের আদলে ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশালে ছয়টি নতুন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠিত হয়েছে। আগে থেকে ছিল আরও চারটি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি। বগুড়াসহ অন্যান্য এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, যেসব এলাকায় ডেভেলপমেন্ট অথরিটি নেই, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকেই পালন করতে হয়। ফলে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও এমন উদাহরণ আছে। বসিলাসহ কিছু এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এসব বিষয়কে একটি সামগ্রিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, অনুমোদিত নকশা ছাড়া নির্মিত ভবন কিংবা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে গড়ে তোলা স্থাপনার বিষয়েও নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপিত হতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিধিমালাটি অনুমোদন পেলে ভবন নির্মাণ ও তদারকির আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে।

আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে জাকারিয়া তাহের বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ব্যাপক পরিসরে আবাসন নিশ্চিত করতে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ৩০ বছর মেয়াদি মর্টগেজ সুবিধা চালু আছে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা না থাকলে বাংলাদেশেও বৃহৎ পরিসরে আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন।

তিনি আরও জানান, বেসরকারি খাত এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এলে সরকারের সহযোগিতা থাকবে।

বেসরকারি আবাসন খাতের নীতিমালায় পরিবর্তন আনার প্রসঙ্গও তোলেন জাকারিয়া তাহের। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে এ বিষয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে নির্ধারিত পরিকল্পনা ও শর্তের মধ্যে থেকেই। পরবর্তী পরিকল্পনা অনুমোদনের বিষয়টি নির্ভর করবে আগের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তার ওপরও।

তিনি জানান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করতে বেসরকারি আবাসন খাতকেও আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে জাকারিয়া তাহের বলেন, বাসযোগ্যতার বিচারে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকা রয়েছে ১৭১তম অবস্থানে। তাই রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তুলতে সরকারকে একযোগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। তবে অতিরিক্ত জনঘনত্বের কারণে কাজটি সহজ নয়। যথাযথ পরিকল্পনার সঙ্গে বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ না থাকলে এ উদ্যোগ সফল করা কঠিন।

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, গত ৫ অক্টোবর বসতি দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের আবাসন বাস্তবতার কথা প্রধানমন্ত্রীও তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তারপরও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে চাইলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনে এগোতে হবে।

জাকারিয়া তাহের বলেন, পরিবেশ রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনবান্ধব আবাসন নীতি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। সেই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণও জরুরি। মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখলে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :