দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য, শিক্ষা-সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণের এক অনন্য ইতিহাস ফেনী থেকে হাজীগঞ্জের খিলপাড়ায় আগমন; জমিদারি থেকে জনসেবায় দীর্ঘ পথচলা
মহিউদ্দীন আল-আজাদ, চাঁদপুর: চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ৩নং কালোচো উত্তর ইউনিয়নের খিলপাড়া—একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। আর এই জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে খিলপাড়া মজুমদার বাড়ি। প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই পরিবার শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, জনকল্যাণ ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে নানা ভূমিকা রেখে আসছে বলে স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
ফেনীর ফুলগাজী পশুররাম অঞ্চল থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বর্তমান খিলপাড়ায় এসে বসতি স্থাপন এবং পরবর্তীতে স্থানীয় জমিদারি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারটির সদস্যরা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে স্থানীয় সমাজে অবদান রেখে আসছেন। বর্তমানে পরিবারের অষ্টম প্রজন্ম খিলপাড়ায় রয়েছে বলে জানা যায়।
ব্রিটিশ আমলে আইনসভার সদস্য জুনাব আলী মজুমদার খিলপাড়া মজুমদার পরিবারের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম মো. জুনাব আলী মজুমদার। ব্রিটিশ আমলে তিনি আইনসভার সদস্য—Member of Legislative Assembly (MLA)—হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ‘সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর এই পরিচিতি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত।
তাঁর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আজও টিকে আছে সাহেব বাজার নামটি। খিলপাড়া গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই বাজারটি স্থানীয় বাণিজ্য ও জনজীবনের একটি পরিচিত কেন্দ্র।
“একজন মানুষের সামাজিক অবদান কখনো কখনো তাঁর মৃত্যুর পরও একটি জনপদের নাম, প্রতিষ্ঠান ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে—সাহেব বাজার তারই একটি উদাহরণ।”
শিক্ষার আলো ছড়িয়েছিলেন মমতাজউদ্দিন মজুমদার পরিবারটির আরেকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মো. মমতাজউদ্দিন মজুমদার, বিএ. বিএড(গনিত)। তিনি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে চট্টগ্রাম শহরের তৎকালীন মুসলিম ইন্টারমিডিয়েট হাই স্কুল( বর্তমানে হাজী মুহসিন কলেজ) গণিতের একজন খ্যাতিমান শিক্ষক ও পরবর্তীতে হেড মাস্টার হিসেবে কাজ করেন। সে সময়ে গনিতের নামকরা শিক্ষক হিসেবে চট্টগ্রাম শহরে সুনাম অর্জন করেছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি ১৯২১ সালের দিকে কোলকাতার আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গনিতে বিএ বিএড উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং তৎকালীন সময়ে উচ্চশিক্ষা পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি হাজীগঞ্জ এলাকার প্রথমদিককার গ্র্যাজুয়েটদের একজন।
শিক্ষার সুযোগ যখন আজকের মতো সহজলভ্য ছিল না, তখন একটি প্রত্যন্ত জনপদ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষকতা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতো শিক্ষিত ও পেশাজীবী ব্যক্তিদের মাধ্যমে খিলপাড়া মজুমদার পরিবার শুধু নিজেদের সামাজিক অবস্থানই সুদৃঢ় করেনি; বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা ও আধুনিক চিন্তার প্রসারেও ভূমিকা রেখেছে বলে স্থানীয়দের অভিমত। অবসর গ্রহনের পর ষাটের দশকে গ্রামে এসে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন পরবর্তীতে যা মাদরাসায় রুপান্তরিত হয়।
এলাকার অবকাঠামো ও ক্রীড়ার উন্নয়নে ড.প্রকৌশলী মোঃ জিয়াউল ইসলাম মজুমদার প্রকৌশল পেশা, জনসেবা ও নেতৃত্বের এক বহুমাত্রিক পথচলা! প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও প্রকৌশলীদের পেশাগত কল্যাণে সক্রিয় এক পরিচিত প্রকৌশলী!
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় প্রকৌশলীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সড়ক যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার অবকাঠামো, গ্রামীণ উন্নয়ন, পানি ও স্যানিটেশনসহ নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রকৌশলীরা পরিকল্পনা, নকশা, বাস্তবায়ন ও তদারকির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এই বৃহৎ প্রকৌশল অঙ্গনের একজন পেশাজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. প্রকৌশলী মোঃ জিয়াউল ইসলাম মজুমদার। বর্তমানে তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (খএঊউ)-এর একজন প্রকল্প পরিচালক (Project Director) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি মমতাজ উদ্দিন মজুমদারের নাতী। তার বাবা মরহুম শফিকুল ইসলাম মজুমদার ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং এলাকায় একজন সৎ ও অত্যন্ত ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। প্রকৌশল পেশার পাশাপাশি সংগঠন, পেশাগত অধিকার, প্রকৌশলীদের কল্যাণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও জিয়াউল মজুমদারের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা রয়েছে। দীর্ঘ পেশাগত জীবনে সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রকৌশলী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ড. প্রকৌশলী মোঃ জিয়াউল ইসলাম মজুমদারের পরিচয়কে বহুমাত্রিক করেছে। এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছেন। তাছাড়া, ছোট বেলা থেকেই একজন ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠক। দাবা, ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন খেলায় তিনি অত্যন্ত পারদর্শী। বর্তমানে এলাকায় তরুণদের খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে শত ব্যস্ততার মধ্যেও আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত পরে বন্ধ হয়ে যাওয়া একতা স্পোটিং ক্লাবটিকে তিনি পুনরায় চালু করে ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজাপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার এডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন।
প্রকৌশলীদের সর্ববৃহৎ পেশাজীবী সংস্থা Institution of Engineers, Bangladesh (IEB)-এর কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও ড. প্রকৌশলী মোঃ জিয়াউল ইসলাম মজুমদারের বহু বছরের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তিনি প্রকৌশলীদের পেশাগত স্বার্থ, মর্যাদা ও কল্যাণের বিষয়গুলোকে সংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন।
জনকল্যাণে জমি দানের অনন্য দৃষ্টান্ত খিলপাড়া মজুমদার পরিবারের ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি হলো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য পারিবারিক জমি দান। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বাজারমূল্যে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যমানের প্রায় এক একর পরিমাণ জমি সরকারি ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য দান করা হয়েছে। এই জমিতে স্থানীয় জনগণের সেবায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে— সরকারি ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান • ৩নং কালচো উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন • ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র • ইউনিয়ন কৃষি অফিস ও সংরক্ষণাগার/গোডাউন • ইউনিয়ন পর্যায়ের ভেটেরিনারি হাসপাতাল • সাবেক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট হল বা সিডি হল একটি পরিবারের মূল্যবান সম্পদ জনসাধারণের সেবায় উৎসর্গ করার এই দৃষ্টান্ত স্থানীয়ভাবে বিশেষভাবে প্রশংসিত। এর ফলে প্রশাসনিক সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি পরামর্শ এবং প্রাণিসম্পদ-সংক্রান্ত সেবা স্থানীয় মানুষের আরও কাছে পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মসজিদ-মাদ্রাসা ও ঈদগাহ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা সরকারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতেও পরিবারটির অবদান রয়েছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, মাদ্রাসা, মসজিদ ও ঈদগাহ প্রতিষ্ঠার জন্যও পরিবারের পক্ষ থেকে জমি দান করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কার্যকর রয়েছে। ফলে পরিবারটির ভূমি দানের কার্যক্রম কেবল সরকারি অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; স্থানীয় মানুষের শিক্ষা, ধর্মীয় জীবন ও সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে।
একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি জনপদের ইতিহাস খিলপাড়া মজুমদার বাড়ির ইতিহাসকে শুধু একটি পরিবারের বংশপরম্পরার ইতিহাস হিসেবে দেখলে এর পূর্ণতা ধরা পড়ে না। কারণ এই পরিবারের সঙ্গে খিলপাড়ার সামাজিক ও অবকাঠামোগত বিকাশের একটি দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।
একদিকে যেমন পরিবারের সদস্যরা আইনসভা, শিক্ষা, সরকারি-বেসরকারি চাকরি ও বিভিন্ন পেশায় অবদান রেখেছেন, অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় জনগণের কল্যাণে সম্পদ দানের ঘটনাও রয়েছে।
এ কারণে খিলপাড়া মজুমদার বাড়ি স্থানীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে।
ভৌগোলিক অবস্থানেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব খিলপাড়া মজুমদার এস্টেটটি হাজীগঞ্জ উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। বালাখাল বাস ও রেলস্টেশন থেকে কুমিল্লা-চাঁদপুর সড়কের উত্তর দিকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে, বালাখাল–নারায়ণপুর গ্রামীণ সড়কের পাশে এর অবস্থান।
খিলপাড়া গ্রামের দক্ষিণ ও উত্তর প্রান্তে রয়েছে দুটি পরিচিত বাজার—সাহেব বাজার ও রাজাপুর বাজার। আর এই দুই বাজারের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত মজুমদার এস্টেট।
ফলে ঐতিহাসিকভাবে এটি শুধু একটি পারিবারিক আবাসস্থল নয়; বরং স্থানীয় যোগাযোগ, বাজারব্যবস্থা ও জনবসতির বিকাশের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
আট প্রজন্মের উত্তরাধিকার অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফেনী থেকে আগমন থেকে শুরু করে বর্তমান অষ্টম প্রজন্ম পর্যন্ত খিলপাড়া মজুমদার পরিবারের ইতিহাস সময়ের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে।
এই দীর্ঘ সময়ে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ—বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে পরিবারটি।
পরিবারের বহু সদস্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করেছেন। অনেকে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে শিক্ষা, প্রশাসন, পেশাজীবন ও সমাজসেবায় পরিবারের অবদান ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি একটি ঐতিহাসিক পরিবারের অবদান শুধু অতীতের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ রাখলে সেই ইতিহাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। তাই খিলপাড়া মজুমদার পরিবারের ইতিহাস, বংশপরম্পরা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, জমিদারি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড, ভূমি দানের দলিল এবং প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জুনাব আলী মজুমদার ও মমতাজউদ্দিন মজুমদারের মতো ব্যক্তিত্বদের জীবন ও কর্মের তথ্য দলিলভিত্তিকভাবে সংগ্রহ করা গেলে বৃহত্তর কুমিল্লা-চাঁদপুর অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাসও সমৃদ্ধ হবে।