সম্ভাবনার নাম রাঙামাটি: পাহাড়, হ্রদ আর অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

আপলোড সময় : ১২-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ১২-১০-২০২৬ ০২:৩১:৪৯ অপরাহ্ন

দেবদত্ত মুৎসুদ্দী, রাঙ্গামাটি: রাঙামাটি শুধু বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলা নয়, এটি সম্ভাবনার এক বিশাল ভাণ্ডার। ৬,১১৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জেলা তার ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্যের কারণে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত গবেষণা ও টেকসই উদ্যোগ।

রাঙামাটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে পর্যটন। কাপ্তাই হ্রদ, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ, যার আয়তন প্রায় ৬৮০ বর্গ কিলোমিটার। এই হ্রদকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম, হাউজবোট, কায়াকিং ও আইল্যান্ড রিসোর্ট গড়ে তোলা সম্ভব। সাজেক ভ্যালি ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য, যেখানে বছরে প্রায় পাঁচ লক্ষ পর্যটক আসেন। এছাড়া শুভলং ঝর্ণা, রাজবন বিহার, পেদা টিং টিং, ঝুলন্ত সেতু, সীতার ঘাট, ফুরোমন পাহাড় প্রতিটি স্পট আলাদা ব্র‍্যান্ডিংয়ের দাবি রাখে। গবেষণা বলছে, শুধু রাঙামাটিতে পর্যটন খাত থেকে বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করা সম্ভব, যদি আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপদ নৌ-পরিবহন ও প্রশিক্ষিত গাইড নিশ্চিত করা যায়। স্থানীয় আদিবাসী হোম-স্টে পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করবে এবং কর্মসংস্থান বাড়াবে।

কাপ্তাই হ্রদ বছরে ৮ থেকে ১০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করে। এর মধ্যে আইড়, চাপিলা, কাচকি ও কাপ্তাইয়ের বিখ্যাত চিংড়ির চাহিদা দেশজুড়ে। খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে খাঁচা চাষ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও হিমাগার স্থাপন করলে এটি একটি রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত হবে। হ্রদের পানি দূষণ রোধে গবেষণা জরুরি এবং মৎস্যজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

রাঙামাটির পাহাড়ি মাটি ফল চাষের জন্য আদর্শ। এখানে বছরে এক লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি আম, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে ও কলা উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে রাঙামাটির আনারস ও কলার স্বাদ অতুলনীয়। কাজুবাদাম ও কফি চাষ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমানে জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার একর জমিতে কাজুবাদাম চাষ হচ্ছে। সাজেক ও বাঘাইছড়িতে কফি চাষে সাফল্য এসেছে। ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, জুস ও জ্যাম শিল্প গড়ে উঠলে পাহাড়ের কৃষক সরাসরি লাভবান হবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। কৃষি গবেষণা কেন্দ্র আরও শক্তিশালী করা দরকার।

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কাপ্তাই হ্রদে ভাসমান সোলার প্যানেল স্থাপন করে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা জাতীয় গ্রিডে বড় অবদান রাখবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে ও পরিবেশ রক্ষা করবে।

রাঙামাটিতে ৪৮ শতাংশ এলাকা বনভূমি। বাঁশ, বেত ও কাঠ ভিত্তিক হস্তশিল্প ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান উৎস। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যাদের ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতে বোনা বস্ত্রের আন্তর্জাতিক বাজার আছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে এই পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়া গেলে নারী উদ্যোক্তারা স্বাবলম্বী হবেন।

সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও আছে, যেমন দুর্গম যোগাযোগ, পাহাড়ে ভূমি বিরোধ ও জলবায়ু পরিবর্তনে হ্রদে পলি জমা। এজন্য প্রয়োজন চারটি কাজ। প্রথমত, রাঙামাটিকে বিশেষ পর্যটন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং ও খাঁচা চাষে সরকারি প্রণোদনা। তৃতীয়ত, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ। চতুর্থত, স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন নীতি গ্রহণ।

রাঙামাটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি ব্লু-প্রিন্ট। পাহাড় ও হ্রদের এই জনপদকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে এটি হবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের রোল মডেল ও সমৃদ্ধির প্রতীক এবং আগামী প্রজন্মের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :