মাহামুদুল ইসলাম জয়, পঞ্চগড়: বাংলাদেশের মানচিত্রের সর্বউত্তরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চগড় যেন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির এক অপূর্ব মিলনভূমি। হিমালয়ের পাদদেশঘেঁষা এই জনপদের একদিকে রয়েছে হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা, অন্যদিকে রয়েছে চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, নদী, পাথর, বালু আর শীতের সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সব মিলিয়ে পঞ্চগড় আজ দেশের পর্যটন মানচিত্রে সম্ভাবনাময় এক জনপদ।
‘পঞ্চগড়’ নামের উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঁচটি প্রাচীন গড়—ভিতরগড়, হোসেনগড়, দেবনগর, রাজনগর ও মীরগড়। এসব গড়ের মধ্যে ভিতরগড় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন এ দুর্গনগরীকে মহারাজ পৃথু রাজার রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রাচীন স্থাপনার কারণে ভিতরগড় পঞ্চগড়ের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।মুঘল আমলেও এ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই সময়ের নানা নিদর্শন আজও পঞ্চগড়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
পঞ্চগড়ের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা মির্জাপুর শাহী মসজিদ। মুঘল স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্য ধারণ করা প্রাচীন এই মসজিদ স্থাপত্যপ্রেমী ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
ইসলাম প্রচারক ১২ জন আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত বারো আউলিয়ার মাজারও পঞ্চগড়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবছর বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবার এখানে বিশেষ আয়োজনকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের সমাগম ঘটে।
অন্যদিকে করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির ও গোলকধাম মন্দির সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। বিশেষ পূজা-পার্বণে এসব স্থানে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ে।
পঞ্চগড় মহিলা সরকারি কলেজে অবস্থিত রক্স মিউজিয়াম দেশের ব্যতিক্রমী প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালাগুলোর একটি। বিভিন্ন ধরনের পাথর, প্রত্নবস্তু ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অতীত ইতিহাস ও ভূ-প্রকৃতির নানা দিক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও পঞ্চগড়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পঞ্চগড় ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন। জেলার একটি বড় অংশ, বিশেষ করে করতোয়া সেতু পর্যন্ত এলাকা, যুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পায়।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ, সংগঠিত যুদ্ধ এবং সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড়ের কৌশলগত গুরুত্ব ছিল বিশেষ। স্বাধীনতার ইতিহাসে এ জেলার অবদান তাই আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যের কারণে পঞ্চগড়ের সবচেয়ে আলোচিত আকর্ষণগুলোর একটি তেঁতুলিয়া। আকাশ পরিষ্কার থাকলে শরৎ ও হেমন্তের শেষভাগ থেকে শীতের শুরুতে তেঁতুলিয়া থেকে দেখা মেলে হিমালয়ের তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার।
সূর্যের আলো পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দূরের পর্বতশৃঙ্গের রং ও দৃশ্যপটও বদলে যায়। ভোরের কোমল আলো কিংবা বিকেলের ম্লান রোদে কাঞ্চনজঙ্ঘার সেই দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন তেঁতুলিয়ায়।
পঞ্চগড়ের আরেক পরিচয় সমতলের চা-বাগান। ১৯৯০ সালে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে সমতল ভূমিতে চা চাষ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে চা-বাগানের পরিধি। নদী ও জনপদের পাশজুড়ে বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান এখন পঞ্চগড়ের অর্থনীতি ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চা-বাগানের সারি, সবুজ প্রান্তর আর পাহাড়ি আবহের অনুভূতি—সব মিলিয়ে পঞ্চগড়ের চা-বাগান পর্যটকদের কাছে এক আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ও মহানন্দার তীর মহানন্দা নদীর তীরে টিলার ওপর অবস্থিত তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ঐতিহাসিক ও নান্দনিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
এখান থেকে মহানন্দার জলধারা, সীমান্তের ওপারের ভারতীয় ভূখণ্ড এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
প্রকৃতির নৈঃশব্দ্য ও সীমান্তঘেঁষা পরিবেশ এ স্থানটিকে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পঞ্চগড়ের নদী ও মাটির নিচ থেকে পাথর ও বালু সংগ্রহ এখানকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদীর তীরে পাথর-বালু সংগ্রহের দৃশ্য পঞ্চগড়ের মানুষের শ্রমনির্ভর জীবনের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।বিভিন্ন রঙ ও আকৃতির পাথরও পঞ্চগড়ের স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে।
দেশের সর্বউত্তরের সীমান্ত পয়েন্ট বাংলাবান্ধা পঞ্চগড়ের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। এখানে স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সীমান্তের জিরো পয়েন্টে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আয়োজনও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। সীমান্তবাণিজ্য, যোগাযোগ ও পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে বাংলাবান্ধা ভবিষ্যতে পঞ্চগড়ের অর্থনৈতিক বিকাশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।