সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা এবং অপমানের ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর মারাত্মক আঘাত। এ ঘটনার চেয়েও অধিক আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ঘটনাটির পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের টাইম টেলিভিশনের এক টকশোতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান যে ভঙ্গিতে এর সাফাই গেয়েছেন এবং পরবর্তীতে প্রকাশ্য প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন।
তিনি নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেছেন, “এটা ঘটতেই থাকবে। আমার মনে হয়, এটা তো কেবল শুরু। সারা পৃথিবীতে এই ঘটনা ঘটবে—যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দেশের মঙ্গল না চাই।” একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গৃহযুদ্ধের উসকানিমূলক হুঙ্কার দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিদেশে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানেই হেনস্তা করার কথা বলেছেন। একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন কথা কোনো বিচ্ছিন্ন আক্রোশ নয়; দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে চেপে বসা একটি জঘন্য স্বৈরাচারী ও মোঘলাই মানসিকতার চরম নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনা ও বক্তব্য বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে এক আশঙ্কাজনক ও অস্থিতিশীল সংকেত দিচ্ছে।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো শীর্ষ ব্যক্তিত্বকে হেনস্তা করার ঘটনাকে যখন কোনো রাজনৈতিক দল তাদের ‘স্বভাবজাত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া’ বা ‘মনের আক্রোশ’ হিসেবে জায়েজ করার চেষ্টা করে, তখন তা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রমাণ করে। এই অপশক্তির কাছে যেন মানুষ মারা, গুম করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া এক স্বাভাবিক ও বৈধ কাজ। আর এসব অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে যারা ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রুখে দাঁড়িয়েছে, তারা যেন অপরাধী! দেড় দশক ধরে দেশে গড়ে তোলা অপশাসন এবং সবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সংঘটিত নজিরবিহীন মানবতাবিরোধী অপরাধের পর এই দলের কোনো নেতার মুখে অণুশোচনার বিন্দুমাত্র লেশ দেখা যায়নি।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনের স্পষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে ও চক্রান্তে প্রায় ১৪০০ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন, নিপীড়ন, গুলি চালিয়ে পঙ্গু ও ক্ষতবশত করা হয়েছে। এই বিভীষিকাময় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আওয়ামী লীগের এই প্রতিনিধি নির্লজ্জের মতো প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কেন ক্ষমা চাইব, আমরা কী করেছি?” এই উক্তিটি বাংলা সাহিত্যের সেই চিরচেনা প্রবাদ—‘চুরি তো করেই, উপরন্তু সিনাজুরি’—কথারই বাস্তব প্রতিফলন। তারা খুন করবে, দেশ লুট করে বিদেশে পাচার করবে, দেশের সার্বভৌমতকে তোয়াক্কা করবে না, আর কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে ধ্বংস করতে চাইবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগের অবদানকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ কারো নেই। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ৬-দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই দলটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সুবিদিত। কিন্তু ইতিহাসের এই ঐতিহাসিক গৌরব কোনো রাজনৈতিক দলকে চিরস্থায়ী নৈতিক বা রাজনৈতিক দায়মুক্তি দিতে পারে না। স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া যেমন গৌরবের বিষয়, ঠিক তেমনই স্বাধীন দেশের মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করাও ছিল সেই ঐতিহাসিক দায়িত্বের অংশ।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও চরম সত্য যে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ একচ্ছত্র শাসনামলে দলটি সেই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে একটি হিংস্র ও নিপীড়ক রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিরোধী মতকে দমন, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার উন্মাদনা শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, কোনো দল অতীত ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের ওপর অত্যাচার চালাতে পারে না; গণঅভ্যুত্থানের বিস্ফোরণে তাদের মসনদ ধুলায় মিশে যেতে বাধ্য হয়।
সিদ্দিকুর রহমানের বক্তব্যে যে বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বিরোধের কথা বলে না, বরং তা প্রকাশ করে সীমাহীন প্রতিশোধপরায়ণতা। প্রবাসে বসে তিনি দাবি করছেন যে ড. ইউনূসকে হেনস্তা করা কিংবা তাঁর মানসিক কষ্ট দেওয়া একেবারেই যৌক্তিক। অথচ একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হওয়ার কথা সংযম ও দায়িত্বশীলতা। প্রবাসে মতপ্রকাশের অধিকার বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ যেমন আইনসিদ্ধ, ঠিক তেমনই কোনো ব্যক্তির ওপর শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন চালানো, ভয় দেখানো এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা সরাসরি আইনবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
যখন একজন নেতা বলেন, “আমার রাগ-আক্রোশ নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতা নেই, নেতাকর্মীদের যেখানেই সুযোগ মিলবে সেখানেই এর বহিঃপ্রকাশ ঘটবে”—তখন তিনি মূলত নিজের সংগঠনকে একটি আইনি কাঠামোসম্পন্ন দল থেকে বিচ্ছিন্ন করে সহিংসতার উসকানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। নিজের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা যার নেই, তিনি কীভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পুনারাবৃত্তির কথা ভাবেন, সেটিই আজ এক বড় প্রশ্ন।
এ অবস্থায় রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা, বিচার ও গণতন্ত্রের জটিল সমীকরণ নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। দেশের সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবী সমাজ আজ কঠোর প্রশ্ন তুলছেন যে, যেসব অপশক্তি রাজনীতি ও সংগঠন করার নামে গণহত্যাকে বৈধতা দেয়, দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে প্রবাসে বসে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং প্রকাশ্যে সন্ত্রাস ও গৃহযুদ্ধের ঘোষণা দেয়—তাদের কি আর রাজনৈতিক ময়দানে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া যায়?
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার থাকলেও তা কখনই আইন ও মানবাধিকারের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যারা নৃশংস গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে এবং তাদের নির্দেশের মূল উৎস নেতাদের বিরুদ্ধে কঠিন আইনগত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে এই সহিংস রাজনীতি ও সন্ত্রাসী মানসিকতাকে বাংলাদেশের রাজপথ ও রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করার সময় এসেছে। এদের যে কোনো ধরনের চক্রান্ত ও সহিংসতাকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো রাজনৈতিক শক্তি স্বৈরাচার কায়েম করার বা জনগণের ওপর গণহত্যা চালানোর দুঃসাহস না পায়।
তবে এর পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে একটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনুধাবন করতে হবে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ কখনোই অন্ধ প্রতিশোধ হতে পারে না। সুবিচারের মূল কথা হলো—ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ঢালাও প্রতিশোধের উন্মাদনায় যেন নিরপরাধ কেউ বলির পাঁঠা না হয়, কারণ অন্ধ প্রতিশোধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়, আর আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী করে। যে রাজনীতি হিংসাকে উসকে দেয়, যে দল অতীতের ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে পারে না, তারা নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকেও ধ্বংস করে ফেলে। সিদ্দিকুর রহমানের মতো অনুসারীদের আচরণ আজ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বদরবারে আমরা কী ধরনের বার্তা দেব, সেটি এখন ঠিক করার সময়। একদিকে যেমন রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম রক্ষা ও একটি নতুন গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠার লড়াই, অন্যদিকে রয়েছে পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রবাসে বসে অস্থিতিশীলতা ও হিংসা ছড়ানোর চক্রান্ত। বাংলাদেশ কখনই কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না এবং জনগণের অধিকার নিয়ে কোনো অপশক্তিকে নতুন করে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া যাবে না।
সুতরাং জুলাই বিপ্লবের হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন দেশ থেকে প্রতিহিংসা ও স্বৈরাচারের রাজনীতি চিরতরে বিদায় নেবে এবং আইনের শাসন, সমতা ও মানবাধিকারের ওপর ভিত্তি করে একটি মর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।