১২ বছর পর একই দিনে বড়াইগ্রামে ফের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় নিহত ১৪

আপলোড সময় : ২১-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ২১-১০-২০২৬ ০৩:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন

নাটোরের বড়াইগ্রামে আবারও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় ফিরে এসেছে ১২ বছর আগের ভয়াবহ স্মৃতি। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর বনপাড়ার রেজুর মোড়ে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৭ জন। ঠিক ১২ বছর পর, ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর একই উপজেলায় বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে আরও ১৪ জনের। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। একই তারিখে এমন প্রাণহানির ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। পাশাপাশি নাটোর-পাবনা মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

মঙ্গলবার ভোররাতে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে জাহেদা ক্লিনিকের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও চারজন। আহত অন্তত ২০ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাঁরা হতাহতদের উদ্ধার এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর কাজে অংশ নেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবুল হায়াৎকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ দুর্ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে মহাসড়কটির নিরাপত্তাব্যবস্থা। স্থানীয়দের কেউ সড়কের অপর্যাপ্ত প্রশস্ততাকে, আবার কেউ যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন। দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী আব্দুস সালামের অভিযোগ, বাসটিতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল এবং সেটি দ্রুতগতিতে চলছিল। তাঁর মতে, অতিরিক্ত যাত্রী ও দ্রুতগতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তবে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে উঠে এসেছে ওভারটেকিংয়ের বিষয়টি। নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক জানান, ট্রাকটি মহাসড়কের বাম পাশের লেন দিয়ে চলছিল। এ সময় দ্রুতগতির বাসটি অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে ট্রাকটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তদন্ত শেষ হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এম এম আরিফুল ইসলাম। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আর কত রক্ত ঝরলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন?”

বড়াইগ্রাম ক্লাবের সভাপতি মো. অহিদুল হক সরকার বলেন, সরু রাস্তার কারণে এ এলাকায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। ডিভাইডারসহ সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, সড়কের প্রশস্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ যান চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সড়কের অবকাঠামোর পাশাপাশি যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং চালকদের দায়িত্বশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।

নাটোর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মো. শহীদুল হক সরকার বলেন, একই মহাসড়কে বারবার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সংস্কার, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসক জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নিহতদের মরদেহ দ্রুত শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং নাটোর-পাবনা মহাসড়কে নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে আটজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তাঁরা হলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সামাদ ফকির (৭০), সোহাগ হোসেন (৩০), জুয়েল রানা (৪০), শালাল মোল্লা (৪৫) ও শাহিন হোসেন (২৫), রাজশাহীর গোদাগাড়ীর বাসচালক সোহেল রানা (৪০), রাজশাহীর বাগমারার আনোয়ার হক (৩০) এবং পটুয়াখালীর তাছফিয়া খাতুন (৮)। বড়াইগ্রামের এ মহাসড়কে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৭ জন নিহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার ১২ বছর পর একই তারিখে আবারও বড় ধরনের প্রাণহানি স্থানীয়দের পুরোনো ক্ষত নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালে সড়কটি চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত এ মহাসড়কে অন্তত ৮৪৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ধারাবাহিক এসব দুর্ঘটনা সড়কটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর সুপারিশ বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :