জলবায়ু সংকট, ঋণ ও নারীর যন্ত্রণা

আপলোড সময় : ২১-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ২১-১০-২০২৬ ০৩:৫৯:০৫ অপরাহ্ন

ঘরই নাকি সব সহনশীলতার কেন্দ্রবিন্দু! কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘরটা কোথায়? ঘরটা কার? ঘরটা কি টিকে আছে? যে ভিত্তির ওপর ঘর দাঁড়িয়ে, সেটাই যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তবে সেই ঘর কতটা নিরাপদ, কতটা টেকসই?

রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় ঘাটতি কমছে, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হচ্ছে। কিন্তু সেই হিসাব মেলাতে গিয়ে যদি কোনো পরিবারকে খাবারের খরচ কাটছাঁট করতে হয়, কোনো শিশুর শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হয় কিংবা কোনো নারীকে সংসার সামলাতে গিয়ে আরও বেশি সময় ধরে রক্ত জল করা শ্রম দিতে হয়, তবে সেই স্থিতিশীলতার প্রকৃত মূল্য আসলে কে দিচ্ছে?

প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত সময়োপযোগী। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর আয়োজিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভা। একদিকে তৃণমূলের জলবায়ু সংগ্রামের দাবি, অন্যদিকে বৈশ্বিক নীতি-নির্ধারকদের ঋণ ও আর্থিক কৌশলের সমীকরণ। এ আয়োজন একটি নির্মম বাস্তবতা স্পষ্ট করে: জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশের সংকট নয়; এটি একাধারে গভীর ঋণ সংকট, সরকারি অর্থব্যবস্থার সংকট এবং কাঠামোগত বৈষম্যের প্রশ্ন।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এ বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। জীবন-জীবিকার সুরক্ষায় যেখানে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সরকারের হাতকে সংকুচিত করে ফেলছে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিকে প্রায়ই প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি কিংবা রাজস্ব ঘাটতির নিরপেক্ষ গাণিতিক হিসাবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সবার জীবনে সমান নয়। সরকার যখন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে, ভর্তুকি প্রত্যাহার করে কিংবা কঠোর রাজস্বনীতি গ্রহণ করে, তখন কোষাগারের চাপ কমলেও তার পুরো বোঝা এসে পড়ে সাধারণ পরিবারগুলোর কাঁধে। এই চাপ সবচেয়ে বেশি গুনতে হয় নারীদের। বাড়তি সংসার সামলানো, স্বজনদের পরিচর্যা কিংবা দৈনন্দিন টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে তাদের অদৃশ্য শ্রমের সময়সীমা কেবলই দীর্ঘ হয়।

আইএমএফ সম্প্রতি স্বীকার করেছে, রাজস্বনীতি নারী ও পুরুষকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে এবং নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে সামাজিক সুরক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। তবে নীতিপত্রে এই বৈষম্য স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; তা নীতিনির্ধারণে কতটা রূপান্তর আনছে, সেটাই বরং মূল প্রশ্ন। জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো নীতিনির্ধারকের কাছে স্রেফ ‘রাজস্ব সংস্কার’। কিন্তু এর ফলে যখন পরিবহন বা খাদ্যের দাম বাড়ে, তখন সাধারণ নারীর অনানুষ্ঠানিক সেবামূলক কাজ হয় বহুগুণ। বাংলাদেশ, মিসর ও কেনিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের কাটছাঁট নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবায় তাদের সুযোগ কমিয়ে দেয়। অবশ্যই অকার্যকর ভর্তুকি ধরে রাখার পক্ষে যুক্তি নেই। তবে কোনো সংস্কারের সফলতা কেবল রাষ্ট্রের সাশ্রয় দিয়ে মাপা ভুল। সমাজে তার সার্বিক প্রভাব হিসাব করাই আসল।

একই চিত্র ঋণ সংকটেও। সম্প্রতি একশনএইডের ২০২৬ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ডেবট ফুয়েলস দ্য ক্লাইমেট ক্রাইসিস’ দেখাচ্ছে, চরম জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা ৬৫টি দেশে রাজস্বের প্রায় ৬৫ শতাংশই চলে যায় পুরোনো ঋণের সুদ ও কিস্তি মেটাতে। এই বরাদ্দ তাদের জলবায়ু অর্থায়নের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ।

একশনএইডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক দক্ষিণের ঋণ পরিশোধের প্রাক্কলিত পরিমাণ আট লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার। এর তুলনায় ২০২৪ সালে বৈশ্বিক উত্তরের কাছ থেকে পাওয়া অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন ছিল তিন হাজার ৯০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ২০২৬ সালে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো জলবায়ু সহায়তা হিসেবে যে অনুদান পাবে, তার চেয়ে প্রায় ২২৫ গুণ অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হবে।

রাজস্বের বড় অংশ ঋণে চলে গেলে স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো কিংবা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানের আর্থিক চাপ সামলাতে গিয়ে রাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যতের সহনশীলতা গড়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছে।

জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এক অদ্র্ভুত চক্রে বন্দি। দুর্যোগের ক্ষতি সামলাতে তাদের ঋণ নিতে হয়, পুনরায় খাপ খাইয়ে নিতে আরও ঋণ লাগে। শেষমেশ তা শোধ করতে নতুন সম্পদের খোঁজ করতে হয়। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন অনুদানের বদলে ঋণ হিসেবে এলে তা সংকট না কমিয়ে দেশের আর্থিক ভঙ্গুরতা বাড়ায়।

এই ধাক্কা কেবল অর্থ মন্ত্রণালয়ে থেমে থাকে না। রাষ্ট্রীয় পরিষেবা দুর্বল হলে অসুস্থ বা শিশু পরিচর্যার ভার ফেলে পরিবারে আর তার সিংহভাগ সামলাতে হয় নারীদের, যার কোনো আর্থিক হিসাব হয় না।

এ কারণেই জলবায়ু ও ঋণকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। ব্যাংককে আন্দোলনকারীরা আজ ঋণের বাতিল বা পুনর্গঠন, দুর্যোগের পর কিস্তি স্থগিতের ব্যবস্থা, অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তহবিল সরিয়ে আনার দাবি তুলছেন। আর্থিক শৃঙ্খলার চেয়ে জরুরি ‘জনবান্ধব সহনশীলতা’ ও ‘আর্থিক ন্যায্যতা’।

মানুষের সক্ষমতাকে কেন্দ্রে রেখে যে সহনশীলতা তৈরি হয় তা-ই হওয়া উচিত আসল লক্ষ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও পরিবেশগত সহনশীলতা কোনো ‘খরচ’ নয়, এগুলো সচল অর্থনীতির মূল অবকাঠামো। বাজেটে নারীর জন্য দু-লাইন বরাদ্দ রাখলেই সমতা আসে না; বাজেটের মাধ্যমে সম্পদে কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং কার জন্য সুযোগ তৈরি হবে– তা পরিবর্তন করাই প্রকৃত সংস্কার।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা স্রেফ সূচকের উন্নতি নয়, সংকটে মানুষের টিকে থাকার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে। যেসব ঘরের ওপর ভিত্তি করে আমরা সহনশীলতার গল্প তৈরি করি, সেগুলোর ভিত্তি আজ ভীষণ নড়বড়ে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনা ও বৈশ্বিক সম্মেলনগুলোয় কেবল ‘রেজিলিয়েন্স’-এর ফাঁকা বুলি উচ্চারিত হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকিমুক্তিতে কোনো গ্রহণযোগ্য বা অর্থবহ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

যে অর্থনীতি তার ব্যালান্স শিট (জমা-খরচের হিসাব) মেলাতে গিয়ে নিজের মানুষকে নিঃশেষ করে, তা কখনও টেকসই হতে পারে না। প্রকৃত স্থিতিশীলতা সেটাই, যা দুর্যোগের মুখেও সাধারণ মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য, মৌলিক সেবা ও নতুন বিকল্পের অধিকার দেয়।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :