পাইকারি থেকে খুচরায় বড় ব্যবধান, ভোক্তার ব্যয় বাড়ার পেছনে দায় কার?

আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০৩:২৯:০৫ অপরাহ্ন

রাজধানীর পাইকারি বাজারে যে দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, স্থানীয় বাজারে তা কিনতে ক্রেতাদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। চাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও আদা থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি এবং গরু-ছাগলের মাংস– প্রায় সব পণ্যের দামই পাইকারি বাজারের তুলনায় স্থানীয় খুচরা বাজারে তুলনামূলক অনেক বেশি রয়েছে।

রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে একই পণ্যের দামে এমন বড় অঙ্কের ব্যবধান লক্ষ করা গেছে। কোনো কোনো পণ্যে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বা তারও বেশি ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, আর মাছ-মাংসের বাজারে এই ব্যবধান আরও বেশি। বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর কাওরান বাজারের পাইকারি বাজার এবং মুগদা, মানিকনগর, খিলগাঁও, বাসাবো ও কমলাপুর এলাকার স্থানীয় বাজারের পণ্যমূল্য তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি ও মাংসের দামের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণে পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবধান স্পষ্ট।

পাইকারি ও খুচরা– উভয় শ্রেণির ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তবে পাইকারি বাজারের তুলনায় স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল, কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি ও দোকানভাড়া বাড়ার কথা জানিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর মুগদা বাজারের ভাই-ভাই জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মোকলেছুদ্দিন মোল্লা বলেন, তার দোকানে ৩ জন কর্মী রয়েছেন। বছরে বছরে তাদের বেতন বাড়াতে হচ্ছে। আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা, এখন সেটি ৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তা ছাড়া দোকানভাড়াসহ বিভিন্ন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে। পাইকারির সঙ্গে খুচরা বাজারে তারা যে ব্যবধানে মুনাফা নেন, সেটি আরও বাড়ানো উচিত বলে দাবি তার। অবশ্য তার এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামে অস্বাভাবিক তারতম্যের পেছনে ‘ওভারহেড খরচ’কে দায়ী করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। দোকানভাড়া, দোকানে চাঁদাবাজি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ– এসব ওভারহেডের অংশ। এই বিশ্লেষক বলেন, ‘একটি দোকানে কী পরিমাণ বিদ্যুতের বিল আসে, তা বিবেচনা করতে হবে। আপনি বাসায় হয়তো আবাসিক হারে বিদ্যুতের বিল দেন, কিন্তু দোকানগুলোকে বাণিজ্যিক হারে বিল দিতে হয়। এ ছাড়া দুই-চার-পাঁচজন কর্মচারী রাখার পেছনেও তাদের অনেক খরচ হয়। এসব ওভারহেড খরচ তুলে আনার একমাত্র জায়গা হচ্ছে পণ্যের দাম বাড়ানো।’ এ কে এম ওয়ারেসুল করিমের মতে, ব্যবধানটা কমানো উচিত। তবে জোর করে এটি কমানো যাবে না। এ জন্য দোকানের ওভারহেড খরচ কমাতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।

চালের দামে কেজিতে ৬ থেকে ৯ টাকা ব্যবধান: চালের দাম পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। রাজধানীর পাইকারি ও স্থানীয় বাজারে চালের দামের তুলনায় দেখা যায়, সব ধরনের চালেই খুচরা বাজারে দাম বেশি। কাওরান বাজারে মোটা চাল গুটি স্বর্ণার ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। এই হিসাবে প্রতি কেজি গুটি স্বর্ণার দাম পড়ছে ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। অন্যদিকে মুগদা, মানিকনগর, খিলগাঁও, বাসাবো ও কমলাপুরের স্থানীয় বাজারে একই চালের দাম ৫২ থেকে ৫৫ টাকা। অর্থাৎ, কেজিতে দামের ব্যবধান ৬ থেকে ৯ টাকা।

পাইজাম চালের ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা। এতে প্রতি কেজির পাইকারি দাম দাঁড়ায় ৪৮ টাকা। স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়। এ ক্ষেত্রে কেজিতে ব্যবধান ৭ থেকে ৮ টাকা। পাইকারি বাজারে আটাশ চাল ২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা, প্রতি কেজি যা পড়ছে ৫৪ টাকা। অথচ স্থানীয় বাজারে একই চালের দাম ৬০ থেকে ৬২ টাকা দেখা গেছে। অর্থাৎ, কেজিতে ৬ থেকে ৮ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। মিনিকেট চালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কাওরান বাজারে রাজু মিনিকেটের ২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ৬৫০ টাকা, কেজিপ্রতি যা মিলছে ৬৬ টাকায়। স্থানীয় বাজারে এই জাতের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৪ টাকায়। ফলে কেজিতে ব্যবধান ৪ থেকে ৮ টাকা। অন্যদিকে পাইকারি বাজারে দাওয়াত মিনিকেটের ২৫ কেজির বস্তা ১ হাজার ৮৫০ টাকা, প্রতি কেজি হারে যা ৭৪ টাকা। অথচ স্থানীয় বাজারে একই চাল ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ, এ চালের দামে কেজিতে ৬ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে।

আলু-পেঁয়াজ-রসুন ও আদার দামে আরও বেশি ব্যবধান: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে আলু ও পেঁয়াজের দামেও পাইকারি ও খুচরা বাজারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। কাওরান বাজারে সাদা ও লাল আলু– দুই ধরনের আলুর কেজি ২০ টাকা। স্থানীয় বাজারে একই আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা কেজি। অর্থাৎ, কেজিতে ১০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বেশি। কাওরান বাজারে বাছাইকৃত বড় আকারের পেঁয়াজের কেজি ৪২ থেকে ৪৪ টাকা। স্থানীয় বাজারে একই ধরনের পেঁয়াজের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। ফলে কেজিতে দামের ব্যবধান ১১ থেকে ১৮ টাকা। আমদানিকৃত রসুন ও আদার দামেও পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। কাওরান বাজারে আমদানিকৃত রসুনের কেজি ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। অর্থাৎ, কেজিতে দামের ব্যবধান ৩০ থেকে ৪৫ টাকা। আমদানিকৃত আদার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। পাইকারি বাজারে আদার কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। স্থানীয় বাজারে দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকা। ফলে কেজিতে ব্যবধান ২০ থেকে ৫০ টাকা। আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার মতো নিয়মিত ব্যবহৃত পণ্যের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান পরিবারের বাজার খরচ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে একসঙ্গে কয়েক কেজি পণ্য কিনলে মোট ব্যয়ের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মাছের দামে কেজিতে ৫০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধান: রাজধানীর বাজারে মাছের দামেও পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। রুই ও কাতলা মাছের দুই কেজি আকারের মাছ কাওরান বাজারে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে একই আকারের মাছের দাম ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা। অর্থাৎ, কেজিতে দামের ব্যবধান ৬০ টাকা পর্যন্ত।

নিম্ন আয়ের মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকা পাঙাশ মাছের ক্ষেত্রেও আকারভেদে দামের পার্থক্য দেখা গেছে। দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের পাঙাশ পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে একই আকারের মাছের দাম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। অর্থাৎ, কেজিতে ব্যবধান ২০ থেকে ৭০ টাকা। অন্যদিকে, আড়াই থেকে তিন কেজি বা তার চেয়ে বড় পাঙাশের কেজি পাইকারি বাজারে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। স্থানীয় বাজারে একই আকারের মাছের দাম ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। এ ক্ষেত্রে কেজিতে ব্যবধান ৩০ থেকে ৮০ টাকা।

মাংসের দামেও খুচরা বাজারে বাড়তি ব্যয়: মুরগির বাজারেও পাইকারি ও স্থানীয় বাজারের দামের ব্যবধান রয়েছে। কাওরান বাজারে পোলট্রি মুরগির কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। ফলে কেজিতে ব্যবধান ১০ থেকে ৩০ টাকা। সোনালি মুরগির কেজি পাইকারিতে ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা। স্থানীয় বাজারে দাম ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ, কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা ব্যবধান রয়েছে। সাদা লেয়ার মুরগির কেজি পাইকারি বাজারে ২৬০ থেকে ২৭০ টাকা। স্থানীয় বাজারে তা ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে কেজিতে ব্যবধান ১০ থেকে ৪০ টাকা। লাল লেয়ার মুরগির ক্ষেত্রে পাইকারি বাজারে কেজি ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে দাম ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা। এ ক্ষেত্রে ব্যবধান ২০ থেকে ৫০ টাকা। আবার গরু ও ছাগলের মাংসের দামেও পাইকারি ও স্থানীয় বাজারে পার্থক্য দেখা গেছে। কাওরান বাজারে গরুর মাংসের কেজি ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা। স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকায়। ফলে কেজিতে দামের ব্যবধান ২০ থেকে ৭০ টাকা। খাসির মাংসের কেজি পাইকারি বাজারে ১ হাজার ৩০০ টাকা। স্থানীয় বাজারে তা ১ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ, কেজিতে ১০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ছাগলের মাংসের কেজি পাইকারি বাজারে ১ হাজার ১৫০ টাকা। স্থানীয় বাজারে দাম ১ হাজার ২০০ টাকা। ফলে কেজিতে ব্যবধান ৫০ টাকা।

মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা দরকার: সার্বিকভাবে রাজধানীর পাইকারি ও স্থানীয় বাজারের পণ্যমূল্য তুলনা করলে চাল থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি ও মাংস প্রায় সব পণ্যের দামে বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যায়। কোনো পণ্যে এই ব্যবধান তুলনামূলক কম, আবার কোনো পণ্যে বেশ বড়। এই ব্যবধান কমাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :