প্রাণ বাঁচানো যেত দুই বাংলাদেশির

আপলোড সময় : ২৬-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৬-১০-২০২৬ ০৯:১৮:৩৩ অপরাহ্ন

কোনটি রাজনৈতিক বক্তব্য, কোনটি প্রতিশ্রুতি আর কোনটি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ প্রশমনের চেষ্টা, তা বোঝা একটি আধুনিক দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। অবাস্তব চিন্তা বা পদক্ষেপ সরকার যেমন গ্রহণ করতে পারে না, তেমনি নাগরিকদেরও অবাস্তব চিন্তা গ্রহণ করা অসচেতনতারই প্রকাশ।

২৩ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বিভিন্ন দেশে দণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি মওকুফের চেষ্টা করছে সরকার। তিনি জানিয়েছেন, কেবল সৌদি আরবেই সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বিভিন্ন কারাগারে আছেন। তাঁর এই বক্তব্যকে আমরা রাজনৈতিক বিবৃতি, সান্ত্বনা বা অবাস্তব পরিকল্পনা বলে ধরে নিতে পারি। শুধু বর্তমান সরকার নয়, আমরা যুগের পর যুগ ধরে ক্ষমতাসীনদের এমন বিবৃতি ও আশ্বাস দিতে দেখে আসছি। পরখ করে দেখলে পরিষ্কার হবে যে এই বিবৃতি বা আশ্বাস বাস্তবসম্মত নয়। ধরা যাক, একজন বাংলাদেশি, পাকিস্তানি বা ভারতীয় সৌদি আরবের একটি বাড়িতে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেললেন অথবা সৌদি আইন ভঙ্গ করে বসলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হবে। সেই মামলার চূড়ান্ত রায়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হলো। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উপায় কী? উপায় যে নেই, তা নয়। তবে এই প্রক্রিয়া সাধারণত কোনো মৌখিক আলোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না। এ জন্য আন্তর্জাতিক কিছু নিয়মনীতি ও রীতি অনুসরণ করতে হয় অথবা দুই দেশের মধ্যে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি থাকতে হয়। এটি অপরাধী প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশন চুক্তি নয়। এক্সট্রাডিশন চুক্তি ভিন্ন বিষয়। বন্দি হস্তান্তর চুক্তির আওতায় কোনো বন্দিকে তাঁর নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে অন্য দেশের আদালতের দেওয়া সাজা নিজ দেশের কারাগারে ভোগ করতে হয়।

দ্বিতীয় আরেকটি উপায় আছে। সেটি হলো কূটনৈতিক তৎপরতা। এই দুটি ক্ষেত্রেই দু-একজন ব্যক্তির বেলায় সম্ভব হলেও ঢালাওভাবে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। আমাদের মতো দরিদ্র দেশের জন্য এ ধরনের তৎপরতার মাধ্যমে কোনো অপরাধীকে ছাড়িয়ে আনা কঠিন। কারণ, ইউরোপীয় দেশগুলো আমাদের মানবাধিকার ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখে না। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের কাছে আমরা মিসকিন বা নিচু জাত বলে পরিচিত। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোকে তোষামোদ করে চলতে হয়। এটি কোনো রাখঢাকের ব্যাপার নয়। তারা স্বেচ্ছায় দয়া দেখালে ভিন্ন কথা, কিন্তু তাদের রাজি করানোর মতো কিংবা কূটনৈতিক চাপ দেওয়ার মতো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আমাদের নেই। সুতরাং সৌদি আরব থেকে সাত হাজার মানুষকে ছাড়িয়ে আনার শক্তি, সামর্থ্য ও দক্ষতা—কোনোটাই আমাদের নেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়ন করবে কে? বিএনপি বা বিএনপির কোনো অঙ্গসংগঠন? না। এটি বাস্তবায়ন করতে হবে বিভিন্ন দেশে থাকা দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে। বিশেষ করে রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারদের বিশেষ নজরদারির মধ্য দিয়ে। সেটা কতটা সম্ভব? এই রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের নিয়ে বলতে গেলে রাতভর লিখলেও ফুরাবে না। কূটনৈতিক দক্ষতা এমন একটি বিষয়, যার মাধ্যমে ছোট একটি দেশও বড় দেশকে রাজি করাতে পারে, নিজের কাজ আদায় করে নিতে পারে এবং মর্যাদা অর্জন করতে পারে, যদি দূতাবাস কূটনৈতিক দক্ষতা দেখাতে পারে। দক্ষতার কথা বাদ দিয়ে যদি সদিচ্ছার কথাই বলি, সেটাও অনেক ক্ষেত্রে কাজে দেয়। দুঃখের বিষয়, সারা পৃথিবীব্যাপী বাংলাদেশের এত মিশন, কিন্তু কোথাও থেকে এমন সদিচ্ছার কোনো উদাহরণ পাওয়া যায় না।

মনে পড়ে, সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক তৎপরতার একটি সফল নজির বাংলাদেশের আছে। ২০১০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ছয় বাংলাদেশিকে সরকার ৯৬ লাখ টাকা ব্লাড মানি দিয়ে ফিরিয়ে এনেছিল। কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। সেটাই ছিল বাংলাদেশের সদিচ্ছার শেষ উদাহরণ।

সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও কান্না দেখা গেছে। ওই দুই বাংলাদেশি অপরাধ করেছেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেই বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করছে এবং তার প্রতিফলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। মানুষ মনে করছে, পবিত্র এলাকায় অশালীনতার জন্য তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারত, কিন্তু একেবারে মৃত্যুদণ্ড?

নেটিজেনদের মধ্যে দ্বিতীয় অসন্তোষ হলো, দুই বাংলাদেশিকে এভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, অথচ বাংলাদেশের দূতাবাস কিছুই জানে না, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না! সম্ভবত এই ক্ষতে প্রলেপ দিতেই প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সান্ত্বনা দিয়েছেন। আমি সৌদি আরবের সব আইনকানুন ঘেঁটে দেখলাম। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ, ঘাঁটাঘাঁটি আরও সহজ। সৌদি আরবে দুই ধরনের আইন চালু আছে। একটি হলো হুদুদ আইন, আরেকটি তা’জির আইন। হুদুদ আইনে কঠোর শরিয়াহর নিয়মকানুন পালন করা হয়। কিন্তু তা’জির আইনে বিচারক তাঁর বিচার-বিবেচনা দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। এ ক্ষেত্রে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের দূতাবাস জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালালে ওই দুই বাংলাদেশিকে প্রাণে বাঁচানো যেত। বাংলাদেশ মিশন তদবির করলে তাঁদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা কোনো অসম্ভব কাজ ছিল না।

এর চেয়ে অনেক গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আমরা ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখেছি। সম্প্রতি রাশিয়া থেকে স্টিফেন হাবার্ড নামে ৭৪ বছর বয়সী একজন শিক্ষককে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে নিয়েছে।

অপরাধ কিন্তু গুরুতর—তিনি ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন এবং রাশিয়ার হাতে ধরা পড়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে ২০১১ সালে পাকিস্তানে সিআইএ এজেন্ট রেমন্ড ডেভিসের কথা মনে এল। প্রথমে দুজন পাকিস্তানিকে হত্যা করেন রেমন্ড। এরপর তাঁকে উদ্ধার করতে উল্টো দিক থেকে একটি সশস্ত্র গাড়ি আসে। সেই গাড়ি চাপা দিয়ে নিরীহ একজন মোটরসাইকেল আরোহীকে হত্যা করে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে ঢুকে যায়। মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তানের বিচারিক ব্যবস্থায় গেলে দীর্ঘদিন এ নিয়ে মামলা ঝুলে থাকতে পারত। কিন্তু সুকৌশলে এই বিচার শরিয়াহ আইনে করা হয় এবং ২৪ লাখ মার্কিন ডলার ব্লাড মানি দিয়ে ডেভিসকে খালাস করা হয়। খালাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে দ্রুত বিমানে তুলে পাকিস্তান থেকে বের করে নেওয়া হয়। এ রকম অনেক ঘটনা আছে।

শক্তিশালী দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশন, জার্মান দূতাবাসসহ যত উন্নত দেশের দূতাবাস আছে, তারা সবাই জানে, কতজন তাদের নাগরিক বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। যেকোনো প্রয়োজনে দূতাবাস বা হাইকমিশন তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে। এমনকি অবস্থানরত এলাকার আবহাওয়ার বার্তাও কখনো কখনো পাঠিয়ে দেয়।

আমরা এত দূর চাই না। সে কপাল আমাদের কস্মিনকালেও হবে কি না, জানি না। তবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, অথচ দূতাবাস কিছুই জানবে না—একেই বলে হারাম খাওয়া।

বাংলাদেশ থেকে হতভাগ্য মানুষ যখন অমানবিক পরিশ্রম করতে মধ্যপ্রাচ্যে যান, তখন প্রতারক, দালাল ও সরকারি কর্মচারীদের নিজের বাপের জমি বিক্রির টাকা ঘুষ দিয়ে বিমানবন্দর পার হন। তারপর চাকরির বেতন পেয়ে সব ভুলে গিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠান। এমন ঘটনাও দেখেছি, প্রতারক-দালাল তিন গুণ টাকা নিয়েছে, তাকেও কষ্টার্জিত অর্থ থেকে খুশি হয়ে উপহারসামগ্রী পাঠাতে। অথচ এই মানুষগুলোকে দেখভাল করার জন্য যাঁদের পেছনে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে মোটা বেতন-ভাতা ও রাজকীয় জীবনযাপনের খরচ জোগানো হয়, তাঁরা তাঁদের খোঁজও রাখেন না। এই মানুষগুলো ওই কূটনৈতিক মিশনগুলোর কাছে কেবল সংখ্যা!

লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :