কৃষক কার্ডে মিলবে স্বল্প সুদে ঋণ, সার-বীজসহ ১০ সেবা

আপলোড সময় : ২৯-১০-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৯-১০-২০২৬ ০৯:৪১:১৮ অপরাহ্ন

বিএনপি সরকারের কৃষক কার্ড কর্মসূচি এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার আগামী চার বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনতে চায়। বড় পরিসরের এ উদ্যোগে কৃষকের নিবন্ধন ও কৃষি উপকরণ সহায়তা যেমন থাকছে, তেমনি সারা দেশে ধাপে ধাপে কার্ডও বিতরণ করা হবে।

এর মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই ৪৩ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার কাজ এগোচ্ছে। পরিকল্পনা হলো দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩টি উপজেলায় থাকা মোট ১৪ হাজার ১৮০টি কৃষি ব্লককে ভিত্তি ধরে কর্মসূচি চালানো।

মাঠের কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কৃষকের তথ্য নেওয়া, ব্যাংক হিসাব খোলা, প্রাক-পাইলটিংয়ের মাধ্যমে কার্ড দেওয়া এবং উপকরণ সহায়তা, সবই চলছে। কৃষকদের নিয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং তাঁদের হাতে আর্থিক ও উপকরণ সহায়তা পৌঁছানোই কর্মসূচির উদ্দেশ্য। প্রথম পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের দিকে বাড়তি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।

ধাপে ধাপে সারা দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও কৃষি ব্লক এই কর্মসূচির আওতায় আসবে। সংশ্লিষ্ট তথ্যে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত ৬৪ জেলার ৫০৩টি উপজেলায় ১ হাজার ৬৮১টি কৃষি ব্লকে তথ্য সংগ্রহের কাজ পৌঁছেছে। এসব ব্লকের ১৯ লাখ ২৫ হাজার কৃষকের তথ্য নেওয়া হয়েছে। আর কৃষক কার্ডের জন্য খোলা হয়েছে ৯ লাখ ব্যাংক হিসাব।

কর্মসূচির প্রাথমিক বাস্তবায়নে তথ্য সংগ্রহ ও হিসাব খোলাকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে বাড়বে কার্ড বিতরণ।

কাজটা কোন পদ্ধতিতে হবে, তা যাচাই করতে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রাক-পাইলটিং করা হয়েছিল। সে সময় আটটি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায়, ১১টি কৃষি ব্লকের ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষক কার্ড হাতে পান। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল, টাঙ্গাইল সদর উপজেলায়। পরে নির্ধারিত এলাকাগুলোতে কাজ এগোয়।

ওই পর্যায়ে আর্থিক প্রণোদনা পান ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে ২০ হাজার ৪৮০ জন। প্রত্যেককে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে দেওয়া হয়, সব মিলিয়ে বিতরণ করা হয় ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা।

সেখান থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর ৫৬ জেলার ৭৭টি উপজেলায় একযোগে ভার্চুয়ালি কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। প্রতি উপজেলা থেকে একটি করে কৃষি ব্লক নেওয়া হয়েছে, তাই এই ধাপে যুক্ত ব্লকের সংখ্যা ৭৭।

এ ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষককে আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭ হাজার ৬৪৩ জন ফেনী জেলার ছয় উপজেলার। কার্ডের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি বাছাই করা এলাকায় উপকরণ সহায়তা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে আগে সুযোগ পাবেন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা। কর্মসূচির তথ্য বলছে, এই পর্যায়ে উপকরণ সহায়তার তালিকায় নাম আছে ১ লাখ ৪৭ জন কৃষকের। এর মধ্যে ফেনীর ছয় উপজেলার ৭ হাজার ১৫৩ জন, বাকি ৫৫ জেলার ৯২ হাজার ৮৯৪ জন।

সব কৃষি ব্লকে একসঙ্গে কর্মসূচি চালু হচ্ছে না, পরিধি বাড়বে ধাপে ধাপে। প্রথমে ফেনী জেলার ছয় উপজেলার ছয়টি কৃষি ব্লকের কৃষকেরা পাবেন ৭ হাজার ৬৪৩টি কার্ড। পরিকল্পনা অনুযায়ী একসময় ৬৪ জেলা, ৫০৩টি উপজেলা আর ১৪ হাজার ১৮০টি কৃষি ব্লকের সবই এর আওতায় আসার কথা।

চার বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে যুক্ত করতে হলে বিপুলসংখ্যক কৃষকের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। তাই তথ্য সংগ্রহ, নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব খোলা ও কার্ড বিতরণ কতদূর এগোল, তা নিয়মিত তদারক করা দরকার। চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখের লক্ষ্য কতটা পূরণ হলো, তা বুঝতে হলেও নিবন্ধন, কার্ড বিতরণ, হিসাব খোলা আর উপকরণ সহায়তার সর্বশেষ তথ্যের দিকেই তাকাতে হবে।

প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা আর ব্যাংকগুলো কতটা সামলাতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে কার্ড বিতরণ বাড়ানো হচ্ছে। লক্ষ্য, কর্মসূচিটিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া।

মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের বড় অংশ সামলাচ্ছে প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্প। প্রকল্পের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (ডিপিডি) মো. রাকিবুজ্জামান খান জানান, কৃষকের নির্ভুল তথ্য নেওয়া, তাঁদের চাহিদা বোঝা এবং কৃষির আধুনিকায়নে সহায়তা দিতে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ চলছে।

তাঁর মতে, মৌসুমভেদে কৃষকের চাহিদা বদলে যায়, তাই কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি হয়ে গেলে প্রয়োজনমতো প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কৃষি উদ্যোক্তা গড়ার উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।

রাকিবুজ্জামান খান জানান, ২২ হাজার কৃষকের তথ্য ইতোমধ্যে নেওয়া হয়ে গেছে। তাঁর মতে, কৃষক কার্ড কর্মসূচির সঙ্গে তথ্য ও কাজ সমন্বিত হলে নানা কৃষিসেবা কৃষকের কাছে পৌঁছানো যাবে, মাঠে সরকারি উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতাও বাড়বে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষক কার্ড সেলের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীন বলেন, কৃষকের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ এবং সরকারি সহায়তা তাঁদের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করাই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এ কারণে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ধাপে ধাপে কার্ড বিতরণের কাজ সমন্বিতভাবে এগোচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান কৃষক কার্ডকে দেখছেন সারা দেশের কৃষককে এক সমন্বিত তথ্যভান্ডারে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত করা যাবে, চাহিদা অনুযায়ী উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা তাঁদের হাতে যাবে, আর কৃষিসেবা দেওয়ার কাজেও শৃঙ্খলা বাড়বে।

সচিবের ভাষ্য, কৃষকের কল্যাণের কথা ভেবে কৃষি ও কৃষকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী ‘কৃষক কার্ড’ চালু করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ও নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষকের হাতে এ কার্ড তুলে দেওয়া হবে।

সেলিম খান জানান, কার্ডধারী কৃষকেরা মোট ১০টি সেবা পাবেন। স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, সেচ, সার, বীজ, প্রণোদনা, কৃষি বিমা, আবহাওয়ার তথ্য এবং বালাইনাশক নিয়ে পরামর্শ রয়েছে এর মধ্যে।

কৃষক তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা পাবেন, সরকার ও রাষ্ট্র তাঁর পাশে আছে—কৃষক কার্ডে এই বার্তাটিই ফুটে উঠছে।

প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দলের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতিটিই ছিল ‘কৃষক কার্ড’। এই কার্ডের আওতায় কৃষক পাবেন ভর্তুকি, সহজ শর্তের ঋণ, শস্যবিমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ফসল বাজারজাত করার সুবিধা—এমন অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। বৈঠকের পর তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, ফ্যামিলি কার্ডের ধাঁচে পাইলট প্রকল্প হিসেবে শিগগিরই কৃষকদের হাতে কার্ড তুলে দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন পরে জানান, পয়লা বৈশাখে কর্মসূচির উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। শুরুতে প্রান্তিক, ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা ভর্তুকির পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন তিনি।

সংখ্যার হিসাব

২০২৩ সালের অক্টোবরেই পার্টনার প্রকল্পের অধীনে ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ দেওয়ার একটি পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল; তখন লক্ষ্য ধরা হয় ২ কোটি ২৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩২১টি কৃষক পরিবার।

এক নজরে

২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, পার্টনার প্রকল্পে মোট ব্যয় ৬ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে ৫ হাজার ৩০০ কোটি, আইফাড ৫০০ কোটি এবং সরকার প্রায় ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৮ মেয়াদের প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায়।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :