জনাবা আসমা বেগম ((ছদ্বনাম) হবিগঞ্জের একজন পঞ্চাশোর্ধ গৃহবধূ। কয়েক মাস ধরে উনার বাম স্তনে চাকার মত কিছু একটা অনুভব করছিলেন। কিন্তু লজ্জা ,ভয় এবং না জানার কারণে কোন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করেন নি। কয়েকদিন পর উনার বাম বগলের নিচেও গুটির মত বুঝতে পারেন। পরবর্তীতে কোনভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করে ঢাকায় আসেন। পরিক্ষা নিরীক্ষা করার পর দেখা গেল রোগটি ক্যান্সার এবং ততদিনে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। এখন ওনার জন্য যে চিকিৎসা প্রয়োজন তা বেশ লম্বা ,দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল।
এখানে কয়েকটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত,স্তন ক্যান্সার বা ক্যান্সার এখন আর দূরের কোনো রোগ নয়। অন্যান্য দেশের মত বংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত , আমদের জ্ঞান , সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক বাধা। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে স্তনের সমস্যা নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে এক ধরনের সংকোচ কাজ করে। এমনকি ক্যান্সার ধরা পড়ার পরও অনেকে এটি নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। অনেক সময় কাছের আত্মীয়স্বজনও জানেন না যে তাদের পরিবারের একজন সদস্য ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এবং সবশেষে বলা যায়, হবিগঞ্জে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা বিশেষায়িত হাসপাতাল এর অপ্রতুলতা। অনেকে ঢাকা বা সিলেট যাওয়ার প্রয়োজনীয় সময়টুকু বের করতে না পেরে অনেক দেরি করে ফেলেন।
অক্টোবর—স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস
স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার গুরুত্ব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই মাসের অন্যতম উদ্দেশ্য। গোলাপি রিবন বা Pink Ribbon স্তন ক্যান্সার সচেতনতার আন্তর্জাতিক প্রতীক।
রোগ ধরা পড়ার প্রক্রিয়া বা স্ক্রিনিং পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত সহজ:
১. নিজে নিজে পরীক্ষা (Self Breast Examination): ২০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে অন্তত একবার নিজের স্তন পরীক্ষা করা উচিত। নিয়ম হলো—মাসিক বা পিরিয়ড শেষ হওয়ার ৩ থেকে ৫ দিনের মাথায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এবং শুয়ে নিজে নিজে স্তন ও বগলের অঞ্চল পরীক্ষা করা। ২. আল্ট্রাসোনোগ্রাম (Ultrasound): সাধারণত কম বয়সী নারীদের জন্য একটি কার্যকরী ও নিরাপদ পরীক্ষা।
৩. ম্যামোগ্রাফি (গধসসড়মৎধঢ়যু): ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে বছরে অন্তত একবার অথবা প্রতি দুই বছরে একবার স্ক্রিনিং ম্যামোগ্রাফি করা বাধ্যতামূলক। ম্যামোগ্রাফি হলো স্তনের এক ধরনের বিশেষ এক্স-রে, যা হাতে কোনো চাকা বা পিণ্ড অনুভব করার অনেক আগেই ভেতরের ক্যান্সার শনাক্ত করতে পারে।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়?
স্তনে কোনো পরিবর্তন হলেই যে ক্যান্সার হবে, এমন নয়। বরং অধিকাংশ চাকা ক্যান্সার নয়। কিন্তু তাই বলে পরীক্ষা না করে উপেক্ষা করা যাবে না। বিশেষ করে— * স্তনে নতুন কোনো গুটি , চাকা বা শক্ত অংশ অনুভূত হওয়া * বগলের নিচে গুটি বা শক্ত অংশ পাওয়া * স্তনের আকার বা আকৃতিতে নতুন পরিবর্তন * স্তনের চামড়ায় অস্বাভাবিক রং পরিবর্তন * নিপলের আকৃতিতে পরিবর্তন বা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া * নিপল দিয়ে অস্বাভাবিক তরল বা রক্তাক্ত স্রাব হওয়া এসবের কোনোটি দেখা দিলে ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় পরিবারের পুরুষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার মা, স্ত্রী, বোন বা কন্যাসন্তানের শরীরে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তাকে ভয় না দেখিয়ে বা লজ্জা না দিয়ে দ্রুত চিকিৎসক এর কাছে নিয়ে যান বা হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরামর্শ গ্রহণ করুন।
কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা ও সত্য “ব্যথা নেই মানে ক্যান্সার নয়”— এটি একটি বড় ভুল ধারণা। প্রাথমিক স্তন ক্যান্সারে সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না।
“স্তন ক্যান্সার শুধু বয়স্কদের হয়”— যদিও বয়স বাড়ার সাথে ঝুঁকি বাড়ে, তবে যেকোনো বয়সের নারীরই এই রোগ হতে পারে।
“ক্যান্সার হলে চিকিৎসা নেই”—এ ধারণাটিও ভুল। আজকাল স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা অনেক উন্নত। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি - বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। সব রোগীর জন্য সব চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। এবং ব্রেস্ট ক্যান্সার থেকে ভাল হওয়ার সম্ভাবনা ও অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় বেশি।
চিকিৎসার জন্য কি ঢাকাতেই যেতে হবে?
কিছু জটিল রোগী বা বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বড় ক্যান্সার সেন্টার এ যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি রোগীকে প্রতিটি চিকিৎসার জন্য বারবার ঢাকায় ছুটতে হবে—এমনটা সবসময় নয়। পরীক্ষা নিরীক্ষা যেমন বায়োপসি , হিস্টোপ্যাথলজি ,এমআরআই এবং রেডিওথেরাপি চিকিৎসা সহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে হবিগঞ্জে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
শেষ কথা
হবিগঞ্জে ক্যান্সার চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ গ্রহন করা উচিত। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া রোগী ও পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী যদি নিজের পরিবার ও পরিচিত পরিবেশের কাছাকাছি থেকে চিকিৎসা নিতে পারেন, তাহলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও অনেক সহজ হয়। আমার সেই রোগীর কথাই যদি বলি,ঢাকায় উনার চিকিৎসার একটি অংশ শেষ করে এখন হবিগঞ্জেই পরবর্তী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অতএব , স্তন ক্যান্সার নিয়ে লজ্জা নয়, কথা বলুন। হবিগঞ্জের প্রতিটি পরিবারে সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ুক। সকলের চিকিৎসা পাবার অধিকার নিশ্চিত হোক।
এই অক্টোবরের বার্তা হোক— “ভয় নয়, লজ্জা নয়—সচেতন হই, সময়মতো চিকিৎসা নেই।”