যুক্তরাষ্ট্রে জুলাই-অক্টোবরে রপ্তানি আয় ৩৩৫ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধি ১১.৫১ শতাংশ

আপলোড সময় : ০২-১১-২০২৬ , আপডেট সময় : ০২-১১-২০২৬ ০৩:১৩:৩৩ অপরাহ্ন

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে বাংলাদেশ রপ্তানি আয় করেছে ৩৩৫ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৩০০ কোটি ডলারের তুলনায় এ আয় ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় একক গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও অটুট রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই-অক্টোবর সময়ে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭০৯ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। এই মোট আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের জোগান এসেছে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে।

দেশের সামগ্রিক রপ্তানি যে হারে বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবৃদ্ধি তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ভোক্তাদের চাহিদায় পরিবর্তন আর আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতার মধ্যেও দেশটিতে এই প্রবৃদ্ধি পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থারই প্রতিফলন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই প্রবৃদ্ধিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ। বাসসকে তিনি এ কথা জানান।

তাঁর ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য। এত বড় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন দেশের রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।’

হাসান আরিফ জানান, বৈশ্বিক অর্থনীতি অনিশ্চিত থাকলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা যথাসময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়া, মানের উন্নতি ঘটানো এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের শর্ত মেনে চলার মধ্য দিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য এই প্রবৃদ্ধি একদিকে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা, অন্যদিকে বিশেষত বড় ভোক্তাবাজারে দেশীয় পণ্যের ধারাবাহিক চাহিদা—দুটোই সামনে এনেছে।

বিকল্প বাজারেও বাড়ছে রপ্তানি

বড় ও প্রচলিত বাজারে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন ও বিকল্প বাজারেও বাংলাদেশের উপস্থিতি বিস্তৃত হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে।

ইপিবির হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বড় বাজারগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে রয়েছে তুরস্ক, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে দেশটি থেকে আয় ছিল ১৫ কোটি ৯৯ লাখ ২০ হাজার ডলার; এবার তা দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে।

সৌদি আরবের বাজারে রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ, আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বেড়েছে ১২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ইউরোপের দেশ স্পেনেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে দুই অঙ্কের ঘরে।

হাসান আরিফ বলেন, প্রচলিত বাজারের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি উদীয়মান বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। এতে রপ্তানির বাজার যেমন বিস্তৃত হবে, তেমনি হাতে গোনা কয়েকটি বড় বাজারের ওপর নির্ভরতাও কমবে।

অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, রপ্তানি বাজারকে ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় করা বাংলাদেশের জন্য দিন দিন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে কোনো একটি দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে, বাণিজ্যনীতি বদলালে বা পণ্যের চাহিদা কমে গেলে সেই ধাক্কা সামলানো সহজ হবে।

যুক্তরাজ্য ও জার্মানির বাজারও বড়

যুক্তরাষ্ট্রের পরেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় গন্তব্যের তালিকায় আছে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে যুক্তরাজ্য থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১৭৪ কোটি ডলার। এর মধ্য দিয়ে দেশটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজারের জায়গা ধরে রেখেছে।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানিতে একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৫৭ কোটি ডলার। তালিকায় এরপর আছে স্পেন ও নেদারল্যান্ডস।

ইউরোপের এসব বাজারে রপ্তানি আয় তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান উৎপাদিত পণ্যগুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থানের চিত্র তুলে ধরছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে। তাই প্রচলিত বড় বাজারগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক অটুট রাখার পাশাপাশি নতুন বাজার খোঁজাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

অক্টোবরে মোট রপ্তানি বেড়েছে ৪.৩৯ শতাংশ

দ্বিতীয় প্রান্তিকের শুরুতেও রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক গতি বজায় আছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এক বছর আগে একই মাসে আয় ছিল ৬৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে দেশটিতে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।

অক্টোবরে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৩৯৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের অক্টোবরের চেয়ে ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি।

সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেশি প্রবৃদ্ধি হওয়ায় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এই বাজারের ধারাবাহিক অবদানই স্পষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের মতে, শুল্কের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের চেয়ে বাংলাদেশ এখন তুলনামূলক সুবিধাজনক জায়গায় আছে। এ কারণেই সেখানে বাংলাদেশি পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকছে এবং রপ্তানি আয়ও বাড়ছে।

তাঁর বক্তব্য, ‘শুল্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমরা অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমাদের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।’

মাহমুদ হাসান খান আরও জানান, বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর বসানো অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়া অথবা তা প্রয়োগ এড়ানোর পথ বের করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিজিএমইএ।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক এড়ানোর বিষয়ে আমরা ইউএসটিআরের সঙ্গে আলোচনা ও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। ধারাবাহিক সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া যাবে বলে আমরা আশাবাদী।’

লক্ষ্য এখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা

রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হলে বাজার ও পণ্যে বহুমুখীকরণ, পণ্যের মানোন্নয়ন, যথাসময়ে সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো বড় বাজারে প্রতিযোগিতায় নিজেদের জায়গা ধরে রাখার পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ালে রপ্তানিকারকদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বদলে যাওয়া চাহিদা ও ভোক্তার পছন্দের সঙ্গে মিল রেখে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

ইপিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান আরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রচলিত বড় বাজারগুলোতে রপ্তানি বাড়ছে, অপ্রচলিত বাজারেও পণ্য সরবরাহ বেড়েছে; এর ফলে সামনের মাসগুলোতেও ইতিবাচক এই ধারা বজায় থাকবে বলে তাঁরা আশা করছেন।

তাঁর মতে, প্রচলিত ও নতুন—দুই ধরনের বাজারেই রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় পৌঁছেছে ১ হাজার ৭০৯ কোটি ডলারে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে তুরস্ক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো নতুন ও বিকল্প বাজারেও রপ্তানি বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের রপ্তানি ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত ও মজবুত করার সম্ভাবনা জাগিয়েছে।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :