কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ: শুল্ক, তাইওয়ান ও ট্রাম্প প্রশ্নে চীনের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

আপলোড সময় : ০৫-১১-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৫-১১-২০২৬ ০৩:০৮:৩৫ অপরাহ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, চলতি সপ্তাহের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে পাওয়া চীনের সামনে একসঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—দুটোই হাজির করেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গতানুগতিক ধারার বাইরের পররাষ্ট্রনীতি আটকে দেওয়ার ক্ষমতা এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে। এই ফল ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের জটিল সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে বেইজিং থেকে পাঠানো এএফপির প্রতিবেদনে উঠে আসা বিশ্লেষকদের কয়েকটি পর্যবেক্ষণ নিচে দেওয়া হলো:

শুল্ক আরোপের ক্ষমতায় কি লাগাম পড়বে?

বিশ্লেষকদের ধারণা, কংগ্রেসের দুই কক্ষই নিয়ন্ত্রণে আসায় আগামী দুই বছর চীনা পণ্যে ট্রাম্পের খেয়ালখুশিমতো শুল্ক বসানোর ক্ষমতা সীমিত করার সুযোগ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।

ট্রাম্পের জন্য এটি বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-চীন তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধের সময় তিনি ব্যাপকভাবে শুল্ককে কাজে লাগিয়েছিলেন। পরে দুই দেশ একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছায়, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা।

সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিন উ সিনবোর মতে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কমিয়ে দিলে ‘চীনের সঙ্গে আলোচনায় শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তাঁর কমে যাবে’।

তবে মার্কিন ব্যবসায়ী মহলে ট্রাম্পের শুল্কনীতি কতটা জনপ্রিয়, সেটিও ডেমোক্র্যাটদের মাথায় রাখতে হবে।

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড্রু থম্পসনের ভাষ্য, সামনের দুই বছরে কংগ্রেস ‘ট্রাম্পের নীতিগুলো বাধাগ্রস্ত করার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাবে’। তবু শুল্কে আরও লাগাম টানার প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটদের সাবধানে এগোতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর যুক্তি, শুল্কনীতি ‘শ্রমিক ইউনিয়ন, শারীরিক শ্রমনির্ভর পেশার কর্মী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে জনপ্রিয়, যাঁরা ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক গোষ্ঠী’।

ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিম মনে করেন, মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়া কিংবা সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলে চীনের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পদক্ষেপে কংগ্রেসের সমর্থন কম থাকতে পারে।

তাইওয়ান কি ‘পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মতো’ বিষয়?

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের গ্রুপ প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং বলছেন, বেইজিং যে গণতান্ত্রিক দ্বীপটিকে নিজের বলে দাবি করে এবং যুক্তরাষ্ট্র যার পেছনে সমর্থন জোগায়, সেই তাইওয়ানের প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্কে ‘পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মতো’ প্রভাব ফেলতে পারে।

তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সহযোগী ওয়াশিংটন। সম্ভাব্য চীনা হামলা মোকাবিলায় দ্বীপটিকে সহায়তা দিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু গত মে মাসে চীনের সঙ্গে আলোচনায় মার্কিন অস্ত্র বিক্রিকে দর-কষাকষির হাতিয়ার বানানোর কথা ট্রাম্প বলার পর ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এরপর তাঁর প্রশাসন ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র সরবরাহ প্যাকেজ কয়েক মাসের জন্য স্থগিত রাখে।

এক বিশ্লেষণী নোটে শিয়ারিং লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বাকি দুই বছরে তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে চীন—বিশেষত বেইজিং যদি মনে করে ওয়াশিংটন অন্য বিষয়ে ব্যস্ত, কিংবা তাইওয়ান প্রশ্নে হস্তক্ষেপ না করার শর্তে ট্রাম্প সমঝোতায় রাজি হতে পারেন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নিজের ‘দারুণ বন্ধুত্বের’ প্রশংসা সম্প্রতি করেছেন ট্রাম্প। অস্ত্রের ওই প্যাকেজ অনুমোদনে ডেমোক্র্যাট ও কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তিনি তাতে সায় দেননি।

উ সিনবোর মতে, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস আগামী বছর তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি আবার শুরু করতে ট্রাম্পকে বাধ্য করতে পারে। তিনি বলেন, ‘এমনটি ঘটলে তা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের স্থিতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

অন্যদিকে এসওএএস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং মনে করেন, চীনের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের নতুন করে সমর্থন দ্বীপটির প্রশ্নে বেইজিংকে আরও সতর্ক অবস্থান নিতে উৎসাহিত করতে পারে।

থম্পসন অবশ্য মনে করিয়ে দেন, অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিতে ট্রাম্পকে বাধ্য করে কংগ্রেস আইন পাস করতে পারলেও প্রেসিডেন্ট তাতে ভেটো দিতে পারেন, ‘অথবা তা উপেক্ষাও করতে পারেন’।

বেইজিং কি ট্রাম্পকে ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখবে?

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও তাঁর সঙ্গে কাজ করার কৌশল চীন বদলাবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ‘বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের নেতা-পর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে এটিকেই সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল উপায় হিসেবে বিবেচনা করতে পারে চীন।’ তাঁর আরও পর্যবেক্ষণ, ‘বেইজিং কিংবা ওয়াশিংটন কোনো পক্ষই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে মৌলিক পরিবর্তন বা বড় ধরনের উন্নতি প্রত্যাশা করছে বলে মনে হয় না।’

এসওএএস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাংয়ের ভাষায়, ‘ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্টের অবস্থানে নেমে আসা ট্রাম্পের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের সুযোগ হিসেবে চীনারা কাজে লাগাবে।’ তবে বেইজিং ‘হিসাব-নিকাশ করে পদক্ষেপ নেবে’ বলেও মনে করেন তিনি; ট্রাম্পকে এমনভাবে চাপে ফেলতে চাইবে না, যাতে তিনি পুরোপুরি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ শুরু করেন।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :