ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর এবং শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন

আপলোড সময় : ০৭-১১-২০২৬ , আপডেট সময় : ০৭-১১-২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। দিনটি ‘বিপ্লব ও সংহতি’ দিবস নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন পথচলা। নানা টানাপোড়েন ও সংকট পেরিয়ে নেতৃত্বে উঠে আসে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক, ‘স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে নেতৃত্বদানকারী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও বিভাজনের চরম সীমায় উপনীত, তখন ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর ঘটনার মাধ্যমে জাতি একটি নতুন দিকনির্দেশনা লাভ করে।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে অগ্রসর হন। অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়ের মাধ্যমে তিনি দেশকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করতে চেয়েছিলেন। বলতে গেলে, জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই প্রথম বাংলাদেশ উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে জন-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি প্রশাসনিক কাঠামোতে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল করেন, যা রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ভিত্তি তৈরি করে। এ ছাড়া তিনি কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণে পদক্ষেপ নেন। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা লাভ করে, যা বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

রাষ্ট্র গঠনে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতার অন্যতম পরিচায়ক হলো তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশকে তথাকথিত ‘তলাবিহীন’ ঝুড়ি থেকে অন্যতম স্বনির্ভর দেশ হিসাবে গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই ১৯ দফার। এ কর্মসূচির মাধ্যমেই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দফাগুলো ছিল কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের স্বনির্ভরতা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা যেন তা দেশের অগ্রগতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নারী ও যুব সমাজকে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা, স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি।

একুশ শতকে এসে বিশ্ব আজ নানা সংকটের মুখোমুখি।

জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র‍্য, বৈষম্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটসহ আরও বহু চ্যালেঞ্জ গোটা বিশ্বকে জর্জরিত করে রেখেছে। এসব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেই জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়কে লক্ষ্য রেখে গৃহীত হয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। এ এসডিজির আওতায় মানবকল্যাণ ও পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, জাতিসংঘের এ টেকসই উন্নয়ন চিন্তাধারার বহু আগেই, অর্থাৎ ৩৮ বছর আগেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। তার এই ঘোষণায় ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠন, কৃষি ও শিল্পোন্নয়ন, দারিদ্র‍্য হ্রাস, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। এমন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনার ফলেই জিয়াউর রহমান পরিণত হন একজন সফল রাষ্ট্রনায়কে। বিশেষ করে, ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পর দেশের যে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের পথে এই ১৯ দফা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির সূচনা করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এখনও জাতির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের কূটনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি সব বিষয়ে ভারতের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল দৃশ্যমান।

সেই প্রভাববলয় থেকে বের হয়ে জিয়াউর রহমান একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা প্রবর্তন করেন। জিয়াউর রহমানের সময়ই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হয়। বিশেষত সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে শ্রমবাজার ও উন্নয়ন সহায়তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এ শ্রমবাজারই বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ ছাড়া ইসলামি সম্মেলন সংস্থায় (ওআইসি) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের এ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার দৃঢ় অবস্থান, বিশেষত, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে সমর্থন বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্বের এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে উদ্যোগী হন। ভারত ও পাকিস্তানের নীরবতার মাঝেই তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার প্রস্তাব দেন, যা পরবর্তী সময়ে সার্ক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

এ ছাড়া স্নায়ুযুদ্ধের সময় কোনো জোটের প্রতি অন্ধ সমর্থন না দিয়ে জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির আরেক অর্জন। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে তিনি আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করেন। তার এ পদক্ষেপ বাংলাদেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

যদি বর্তমান সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, নীতি ও উন্নয়ন দর্শনকে অনুসরণ করে রাষ্ট্রগঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে যায়, তবে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। তাই দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে শহীদ জিয়াউর রহমানের নীতিকে অনুসরণ করে রাষ্ট্রগঠনের কাজে মনোযোগী হওয়াই সময়ের দাবি। সত্যিকার অর্থেই বর্তমান বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন প্রতিফলিত হলে দেশ হবে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ।

সম্পাদকীয় :

 সম্পাদক ও প্রকাশক : এসএম শহীদ উল্লাহ, নির্বাহী সম্পাদক : শারমিন সুলতানা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এসকে তমিজ উদ্দিন

অফিস : ১৯৩/১ (৩য় তলা) মতিঝিল, ঢাকা - ১০০০ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল : 01753492430, ই-মেইল : ajkerawaz73@gmail.com

অফিস :