সহকারী শিক্ষকদের দাবিতে তিন সংগঠনের কঠোর প্রতিবাদ
দশম গ্রেডসহ ৩ দফা দাবির আন্দোলনে পুলিশি নির্যাতনের ঘটনার বিরুদ্ধে একযোগে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে তিনটি জাতীয় সংগঠন
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ পিটিআই কর্মকর্তা সমিতি, এবং বাংলাদেশ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অ্যাসোসিয়েশন।
রবিবার (৯ নভেম্বর) এসব সংগঠন আন্দোলনরত সহকারী শিক্ষকদের দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে দ্রুত সমাধানে সরকারের প্রতি দৃঢ় আহ্বান জানায়। পাশাপাশি পুলিশি হামলায় জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে।
“অতর্কিত হামলা, শতাধিক শিক্ষক আহত” - প্রধান শিক্ষক সমিতি
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি রিয়াজ পারভেজ এবং সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম লিখিত বিবৃতিতে বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অতর্কিত লাঠিচার্জ ও দমনপীড়নে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। হামলায় শতাধিক শিক্ষক আহত হওয়া অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য।
সমিতি জানায়, শিক্ষকদের দশম গ্রেড ও গ্রেড-সংক্রান্ত অন্যান্য দাবি দীর্ঘদিনের; এ বিষয়ে আশু যৌক্তিক সমাধান সরকারের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
“বর্বর হামলা”—সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অ্যাসোসিয়েশন
বাংলাদেশ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার অ্যাসোসিয়েশনও ঘটনাটিকে “বর্বর ও মানবাধিকারবিরোধী” আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনের আহ্বায়ক মুহম্মদ মিলন মিয়া এবং সদস্য সচিব আল আমিন হাওলাদার লিখিত বিবৃতিতে বলেন— এই হামলা স্বাধীন দেশে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী; শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তারা দাবি করেন, জড়িত পুলিশ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষকদের দাবি মানবিক বিবেচনায় দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়।
পিটিআই কর্মকর্তা সমিতির তীব্র নিন্দা
বাংলাদেশ পিটিআই কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি মো. শাহ আলম সরকার ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হাসান বলেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষকরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করা কিংবা আন্দোলন দমনে শারীরিক আক্রমণ করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
তারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
কেন এই গ্রেড–বৈষম্য? পটভূমিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন
পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা বর্তমানে ১০ম গ্রেডে বেতন পান। অথচ সরকারের অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে আছেন। একই সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালন করলেও বৈষম্যমূলক গ্রেড বহাল থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষকরা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন—Sub-Inspector, Nurse, Upazila Agriculture Officer, Union Parishad Secretary, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের Administrative Officer এমনকি বিভিন্ন Personal Officer—অনেকে ১০ম গ্রেড সুবিধা ভোগ করেন। সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডও পাননি—এ অভিযোগ তাদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
শহীদ মিনারে অবস্থান, শাহবাগে ‘কলম বিসর্জন’—তারপর সহিংসতা
৮ নভেম্বর, শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। নেতৃত্ব দেন বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা: মো. আবুল কাসেম, খায়রুন নাহার লিপি, মো. শামছুদ্দিন মাসুদ, মু. মাহবুবুর রহমান, মোহাম্মদ আনোয়ার উল্যা প্রমুখ।
দুপুরে অবস্থান কর্মসূচি থেকে শাহবাগে গিয়ে শিক্ষকরা ‘কলম বিসর্জন’ পালনকালে শুরু হয় লাঠিচার্জ, জলকামান ও Sound Grenade নিক্ষেপ। ঘটনায় ১০৯ জন শিক্ষক আহত হন, গ্রেপ্তার হন ৫ জন। পরে রবিবার পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।
শিক্ষক–শিক্ষার্থীর প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে
শনিবার রাতেই শহীদ মিনারে শিক্ষকরা মোমবাতি প্রজ্বলন করে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ জানান। পরদিন (৯ নভেম্বর) সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কর্মবিরতি শুরু হয়। অনেক স্থানে ছাত্র–ছাত্রীরাও প্রতিবাদে যুক্ত হয়।
শহীদ মিনারের অবস্থান কর্মসূচি থেকে শিক্ষকরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের পদত্যাগ দাবি করেন।