• মতামত
  • ডেমোক্র্যাটরা সাবধান! ট্রাম্পের ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ বনাম মার্কিন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

ডেমোক্র্যাটরা সাবধান! ট্রাম্পের ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ বনাম মার্কিন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

মতামত ১ মিনিট পড়া
ডেমোক্র্যাটরা সাবধান! ট্রাম্পের ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ বনাম মার্কিন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ে ক্ষুব্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী? ফেডারেল তহবিল বন্ধ করা থেকে শুরু করে আসন পুনর্বিন্যাস (Gerrymandering) পর্যন্ত—মার্কিন রাজনীতিতে ‘বিচারিক প্রতিশোধ’ (Vendetta Politics)-এর ছক কষছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট।

সূচনা: ডেমোক্র্যাটদের উল্লাস ও ট্রাম্পের নীরব ক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও মেয়র নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় ডেমোক্র্যাট শিবির ও বিশ্বের বহু মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। বিশেষ করে, হোয়াইট হাউস, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ সব হারানোর ঠিক এক বছর পর এই জয়গুলো ডেমোক্র্যাটদের জন্য ছিল অক্সিজেন-স্বরূপ। নিউইয়র্কের মতো বড় শহরে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক বিজয় এই উল্লাসের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নিউ জার্সি ও ভার্জিনিয়ার গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে, যা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর (Midterm Elections) জন্য এক ইতিবাচক সংকেত।

কিন্তু এই বিজয় উদ্‌যাপন ডেমোক্র্যাটদের জন্য এখন সতর্কবার্তা। কারণ, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হার মানতে নারাজ। এই পরাজয়গুলো তাকে ক্ষুব্ধ করেছে এবং তিনি যে কোনো মূল্যে পরবর্তী নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে ‘ন্যায় বা অন্যায্য’ (Fair or Unfair) যেকোনো পথ অবলম্বন করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। তার এই মনোভাবে মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের 'প্রতিশোধের রাজনীতি' (Retaliation Politics) বা 'ভেণ্ডাটা পলিটিক্স'-এর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

‘মামদানি মার্ক্সবাদী দল’: গণমাধ্যমে আক্রমণ ও প্রোপাগান্ডা

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্রোধ বিশেষভাবে নিপতিত হয়েছে নিউইয়র্কে মামদানির জয়ের উপর। তিনি মামদানিকে 'এক কমিউনিস্ট পাগল' (A Communist Lunatic) বলে আখ্যায়িত করেছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরই তার সমর্থিত মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (MAGA) শিবির ও প্রভাবশালী ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।

মিডিয়া প্রোপাগান্ডা: নিউইয়র্ক পোস্ট তাদের প্রথম পাতায় মামদানির ব্যঙ্গ ছবি ছেপে তাকে সোভিয়েত প্রতীকের সঙ্গে তুলনা করে 'দ্য রেড অ্যাপল' শিরোনাম দেয়। ফক্স বিজনেস চ্যানেল-ও 'বলশেভিক' ধাঁচের গ্রাফিকস ব্যবহার করে সমাজতন্ত্রের 'বৈশ্বিক হুমকি' (Global Threat) নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করেছে।

রাজনৈতিক কৌশল: রিপাবলিকানদের লক্ষ্য হলো, আগামী বছরের মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের একটি 'মামদানি মার্ক্সবাদী দল' হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা।

আসন পুনর্বিন্যাস: গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা (Gerrymandering)

ট্রাম্প শুধু প্রোপাগান্ডাতেই থেমে নেই, তিনি সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছেন। তার প্রধান কৌশল হলো, নির্বাচনী আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ (Gerrymandering) করে ডেমোক্র্যাটদের ভোট কমিয়ে রিপাবলিকানদের জন্য 'নিরাপদ আসন' (Safe Seats) তৈরি করা।

টেক্সাস ও ক্যালিফোর্নিয়া: ট্রাম্পের চাপে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা কংগ্রেসীয় সীমানা এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করিয়েছে যে পাঁচটি নতুন 'নিরাপদ রিপাবলিকান আসন' তৈরি হয়েছে। এর জবাব হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটরাও ভোটারদের অনুমতি নিয়ে আসন পুনর্বিন্যাস করে আরও পাঁচটি আসন বাড়ানোর অনুমোদন পেয়েছে।

অন্যান্য অঙ্গরাজ্য: ট্রাম্প নর্থ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, মিসৌরি ও ইন্ডিয়ানার রিপাবলিকানদেরও একইভাবে এলাকা পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভোটাররা রিপাবলিকানদের ছেড়ে গেলেও যাতে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস (House of Representatives) রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

ক্ষমতার অপব্যবহার ও ফেডারেল হস্তক্ষেপের হুমকি

ট্রাম্পের সবচেয়ে ভয়ানক হুমকি হলো, ক্ষমতা পেলে তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। তিনি ইতিমধ্যে নিউইয়র্কে ফেডারেল তহবিল (Federal Funding) বন্ধ করে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প এর আগেও ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেসে সেনা পাঠিয়েছেন এবং শিকাগো ও পোর্টল্যান্ডে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন।

যদি আগামী বছরে ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ আবার নিজেদের দখলে নিতে পারে, তবে তারা প্রেসিডেন্টের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের জবাবদিহির (Accountability) আওতায় আনা সম্ভব হবে। ট্রাম্প যেকোনো উপায়ে এই ফলাফল এড়াতে চাইছেন, যা মার্কিন গণতন্ত্রের 'ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন' (Free and Fair Election)-এর ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।