দেশের সমগ্র নার্সিং সেক্টর মাত্র আট ব্যক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে এক বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি থেকে শুরু করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ—সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমল থেকে এই চক্রটি বদলি-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল হলেও তাদের দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং একই ধারা অব্যাহত রেখেছে তারা।
এই সিন্ডিকেটের স্বেচ্ছাচারিতা এবং দুর্নীতির কারণে সাধারণ নার্সদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। যেখানে সাধারণ নিয়মে বদলির আবেদন করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে এই চক্রের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে পোস্টিং চূড়ান্ত হয়ে যায় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রে যারা
গত ১৫ জুলাই নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ন্যাব) পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন:
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (জুয়েল) - সিনিয়র স্টাফ নার্স, নিটোর
মো. শরিফুল ইসলাম - সিনিয়র স্টাফ নার্স, জাতীয় নার্সিং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান
ফারুক হোসাইন - সিনিয়র স্টাফ নার্স, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
বিশ্বজিৎ বড়ুয়া - নার্সিং ইনস্ট্রাক্টর, চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজ
আহসান হাবিব - সিনিয়র স্টাফ নার্স, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি
মো. সাইব হোসাইন রনি মোল্লা - নার্সিং ইনস্ট্রাক্টর, বরিশাল নার্সিং কলেজ
ইসরাত জাহান - সিনিয়র স্টাফ নার্স, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ
মো. আনিসুর রহমান - সিনিয়র স্টাফ নার্স, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল
অভিযোগে বলা হয়, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রশ্রয়েই এই চক্রটি এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
দুর্নীতির জাল কতটা বিস্তৃত?
এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তালিকা বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশ্নফাঁস: ২০১৭ সালের নার্স নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে এই চক্রের সদস্যরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
বদলি ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণ: অর্থের বিনিময়ে পছন্দসই স্থানে বদলি এবং যোগ্যদের ডিঙিয়ে অযোগ্যদের পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়া তাদের আয়ের প্রধান উৎস।
চাঁদাবাজি: বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ নার্সদের থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়।
ব্যক্তিগত ব্যবসা: সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় একাধিক সদস্য নিজেদের নামে-বেনামে নার্সিং কলেজ পরিচালনা করছেন।
কমিশন বাণিজ্য: সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে কমিশনের বিনিময়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।
অন্যান্য অপরাধ: ছাত্রীনিবাসের কক্ষ দখল, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং সরকারি ওষুধ চুরির মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন চক্রের সদস্যরা।
ক্ষমতার দাপট ও রাজনৈতিক পরিচয়
অভিযোগ অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মো. আনিসুর রহমান এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। তিনি নিজেকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে অধিদপ্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন। তার বিরুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্টিন দখল, হুমকি ও হেনস্তার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে বদলি করা হলেও অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপে তিনি ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জে পোস্টিং পান, যেখান থেকে তিনি এখনো সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অবশ্য মো. আনিসুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, "আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সত্য নয়।"
একইভাবে নিটোরের সিনিয়র স্টাফ নার্স মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (জুয়েল) এর বিরুদ্ধেও বদলি-বাণিজ্য এবং বেসরকারি হাসপাতালে রোগী পাঠানোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। তিনিও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমাকে হেয় করতে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে।"
মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ ও অধিদপ্তরের ভূমিকা
লিখিত অভিযোগটি আমলে নিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসেছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সহকারী সচিব মো. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দের কাছে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত চাওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মহাপরিচালক বলেন, "আট নার্সের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছি। শিগগিরই এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে মতামত দেওয়া হবে।" তার বিরুদ্ধে ওঠা নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, "আমার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।"
এই তদন্তের ফলাফল এখন দেশের স্বাস্থ্য খাতের স্বচ্ছতা এবং হাজার হাজার নার্সের ভবিষ্যৎ কর্মপরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।