চীনের মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। এই প্রথমবার তিনজন নভোচারীর সঙ্গে মহাকাশে পাঠানো হলো চারটি জীবন্ত ইঁদুর। দেশটির উচ্চাভিলাষী মহাকাশ কর্মসূচির অংশ হিসেবে, শেনঝো-২১ (Shenzhou-21) মহাকাশযানে চেপে এই বিশেষ যাত্রীরা চীনের তিয়ানগং স্পেস স্টেশনের (Tiangong Space Station) উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এই মিশনের মূল লক্ষ্য হলো Microgravity বা প্রায় শূন্য-মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে জীবদেহে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
মিশন শেনঝো-২১: এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ
শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) রাতে চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত জিয়ুয়ান স্যাটেলাইট লঞ্চ সেন্টার থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় শেনঝো-২১ মহাকাশযান। উৎক্ষেপণের মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে এটি তিয়ানগং স্পেস স্টেশনের সঙ্গে সফলভাবে সংযুক্ত (docking) হয়।
এই মিশনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমান্ডার ঝাং লু, এবং তার সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার উ ফেই এবং পে-লোড স্পেশালিস্ট (Payload Specialist) ঝাং হংঝাং। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এই তিনজন নভোচারী আগামী ছয় মাস মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করে প্রায় ২৭টি ভিন্ন ভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রকল্প পরিচালনা করবেন। মহাকাশ স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার দায়িত্বও থাকবে তাদের উপর।
কেন মহাকাশে ইঁদুর?
এই মিশনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো নভোচারীদের সঙ্গে পাঠানো চারটি ল্যাবরেটরি ইঁদুর, যার মধ্যে দুটি পুরুষ এবং দুটি স্ত্রী। চীনের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এটিই প্রথম রডেন্ট (rodent) পরীক্ষা। বিজ্ঞানীরা মূলত জানতে চান, Microgravity পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকলে মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে কী ধরনের জৈবিক এবং জিনগত পরিবর্তন ঘটে।
ইঁদুরগুলোর শারীরিক গঠন এবং জেনেটিক কাঠামো মানুষের সঙ্গে অনেকাংশে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য भविष्यে দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ যাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ साबित হবে। এই ইঁদুরগুলোকে পাঁচ থেকে সাত দিন মহাকাশে পর্যবেক্ষণের পর পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে এবং তাদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা চলবে।
মহাকাশে চীনের একলা চলার প্রেক্ষাপট
একসময় মহাকাশ গবেষণায় ও আমেরিকার একাধিপত্য থাকলেও চীন ধীরে ধীরে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি আইনের মাধ্যমে চীনকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station) থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপরই বেইজিং নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তৈরির পথে হাঁটে এবং ২০২১ সালে তিয়ানগং স্পেস স্টেশন স্থাপন করে ইতিহাস তৈরি করে।
তারপর থেকেই প্রতি ছয় মাস অন্তর চীন তাদের মহাকাশ স্টেশনে গবেষণার জন্য তিনজন নভোচারীর একটি করে দল পাঠিয়ে আসছে। শেনঝো-২১ সেই ধারাবাহিকতায় চীনের সপ্তম নভোচারী মিশন। শুধু তাই নয়, আগামী বছর পাকিস্তান থেকে প্রথম বিদেশি নভোচারীকে তিয়ানগং স্টেশনে পাঠানোর পরিকল্পনাও করছে বেইজিং, যা তাদের মহাকাশ কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০-এর দশকে মহাকাশ প্রযুক্তি এবং আধিপত্য নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।