• মতামত
  • মওলানা ভাসানী: কেন তিনি ছিলেন তারুণ্য, আশা ও আপসহীন সংগ্রামের শাশ্বত প্রতীক?

মওলানা ভাসানী: কেন তিনি ছিলেন তারুণ্য, আশা ও আপসহীন সংগ্রামের শাশ্বত প্রতীক?

মতামত ১ মিনিট পড়া
মওলানা ভাসানী: কেন তিনি ছিলেন তারুণ্য, আশা ও আপসহীন সংগ্রামের শাশ্বত প্রতীক?

'হাসি'র উৎসমুখ খুঁজতে ছিয়ানব্বই বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম; কেন তাঁর রাজনীতি ছিল না 'দাবার খেলা', বরং গণমানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন?

সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী – একটি নাম নয়, একটি মহাদেশের মতো বিস্তৃত এক জীবন ও ইতিহাসের নাম। তাঁর কর্মজীবন, চেতনা এবং আদর্শের মূল ভিত্তি ছিল আপসহীন সংগ্রাম। কেন তিনি আজও দেশের তারুণ্য এবং আশার এক অপরিহার্য প্রতীক হয়ে আছেন, তা বোঝার জন্য তাঁর জীবনদর্শন ও রাজনীতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

চীনের 'হাসি' আর দেশের কৃষকের মুখ

মওলানা ভাসানী ১৯৬৩ সালে চীন সফর করেন। 'মাও সেতুঙের দেশে' নামক ছোট বইটিতে তিনি চীনের মানুষের 'হাসি'তে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সেই হাসি ছিল প্রাণের প্রাচুর্য আর জীবনের উচ্ছ্বাসে ভরা। দেশে ফিরে যখন তিনি নিজের দেশের কোটি কোটি কৃষকের মুখের সঙ্গে চীনের কৃষকদের মুখের তুলনা করেন, তখন তাঁর কণ্ঠে এক ব্যাকুল প্রশ্ন ধ্বনিত হয়— "আমরা কি হাসির উৎসের সন্ধান পাব না?"

এই একটি প্রশ্নই মওলানা ভাসানীর সমগ্র জীবনের Core Value বা মূল সত্যকে উন্মোচন করে। তিনি আজীবন সেই উৎসের সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন, যার ওপর বঞ্চনা ও নিপীড়নের পাথর চাপা পড়ে আছে। তাঁর পণ ছিল, সেই পাথর সরিয়ে, নদীকে মুক্ত করে, শ্রমজীবী মানুষের অনাহারক্লিষ্ট মুখে হাসি ফোটানো। কোনো গ্রন্থ বা সংগঠনে নয়, মওলানা তাঁর সংগ্রামমুখর জীবনকেই দেশের ইতিহাসের কাছে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে রেখে গেছেন।

জীবনের মূল সত্য: নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম

ছিয়ানব্বই বছরের দীর্ঘ ও বিচিত্র কর্মজীবনের মূলকথা কী? এ প্রশ্নের উত্তরও ভাসানী চীন সম্পর্কে যেমন সহজভাবে দিয়েছিলেন, তেমনি তাঁর জীবন সম্পর্কেও এককথায় বলা যায়— তা হলো 'সংগ্রাম' (Struggle)। একটানা, নিরবচ্ছিন্ন এবং আপসহীন সংগ্রাম।

এই সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট: মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি ছিলেন যেন রূপকথার সেই রাজপুত্র, যিনি আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে সেই নরশত্রু দৈত্য ও প্রতারক জাদুকরকে খুঁজছেন, যে নদীর উৎসমুখে পাথর চাপা দিয়েছে। তাঁর সংগ্রাম ছিল মেহনতি মানুষের জীবনকে জীবন্ত করার লক্ষ্যে। মওলানা দেখেছেন, অনেকে গরিব-দুঃখীর মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতার উচ্চাসনে উঠে কেবল নিজেই হেসেছেন, আর দেশ কেঁদেছে। কিন্তু তিনি তাদের পথে হাঁটেননি।

রাজনীতিতে শত্রু ও মিত্রের তাৎপর্য

মওলানা ভাসানী অন্য সব রাজনীতিকের থেকে এখানে পৃথক ছিলেন। তিনি রাজনীতিতে শত্রুকে প্রধান গুরুত্ব দিয়েছেন, তারপর মিত্রকে। অন্যদের মতো তিনি শুধু মিত্র খুঁজে সুবিধা নিতে চাননি, বরং জনগণের পাশে থেকে তাদের সংগঠিত শক্তিকেই (Organised Public Power) নিজের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

তাঁর মতে, সেই নরশত্রু দৈত্য ও জাদুকর ছিল 'সাম্রাজ্যবাদ' (Imperialism) ও 'সামন্তবাদ' (Feudalism)। তিনি জানতেন, জমিদারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত লড়াই অবান্তর, আসল লড়াই হলো 'জমিদারি প্রথা'-র বিরুদ্ধে, কারণ ব্যবস্থা টিকে থাকলে জমিদার একজন যাবে, আরেকজন আসবে। তিনি ছিলেন একজন সংস্কারক নন, বরং একজন 'বিপ্লবী' (Revolutionary)।

গ্রাম্য বিচ্ছিন্নতা নয়, বৃহত্তর রাজনীতির চেতনা

মওলানা অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানতেন, সামন্তবাদের পেছনে রাষ্ট্রীয় শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির পেছনে সাম্রাজ্যবাদের Global Power Structure কাজ করে। তাই সামন্তবাদবিরোধী যুদ্ধ কোনোভাবেই রাজনীতি-নিরপেক্ষ হতে পারে না, তা আবশ্যিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।

যারা ভাবতেন নাইট স্কুল বা টিউবওয়েল স্থাপন করলেই কৃষকের মুক্তি আসবে, মওলানা তাদের পথের পথিক ছিলেন না। তিনি জানতেন, দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে গেলে কৃষককে এই বৃহত্তর রাজনীতিতে যুক্ত করতে হবে। তিনি লিখেছেন: "কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণিকে যদি কেবল অসহায় ও দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করার কাজে ব্যাপৃত রাখা যায়, তবে তারা আর রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করার সময় পাবে না। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনযন্ত্র সম্পর্কে কৃষক শ্রমিকদের উদাসীন রাখা গেলে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অব্যাহত রাখা সহজ ও সম্ভব হয়।" – মওলানা এই Imperialist Strategy সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন।

দাবার খেলা নয়, বাঁচা-মরার সংগ্রাম

একদা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, মওলানার মতো 'আবেগী' ব্যক্তিরা নেতা হওয়ার যোগ্য নন; রাজনীতি হলো দাবার খেলা। জিন্নাহ ও ভাসানীর এই পার্থক্য কেবল দু'জনের পোশাক বা ভাষার পার্থক্য ছিল না, ছিল দুটি বিপরীত জীবনদৃষ্টির (Ideology) দ্বন্দ্ব।

মওলানার কাছে রাজনীতি মোটেই 'দাবার খেলা' ছিল না, তা ছিল দেশের কৃষক-শ্রমিকের কাছে বাঁচা-মরার সংগ্রাম। তিনি প্রকাশ্যে কেঁদেছিলেন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তাঁর রাজনীতি বড়লোকদের বসবার ঘরে নয়, অবস্থান করত মাঠে, রাজপথে, মিছিলে, ঘেরাওয়ে। তাঁর পরিশ্রম, সাহস ও প্রতিজ্ঞার উৎস ছিল কোনো খেলায় জেতার ইচ্ছায় নয়, ছিল সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কঠিন অভিপ্রায়ে।

মওলানা ছিলেন এ দেশের আবেগের প্রতিনিধি। তিনি আবেগকে সংগঠিত করে রাজনীতিতে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, বঞ্চিত মানুষের আবেগ স্বাভাবিক নিয়মেই ক্ষমতার শত্রু ও বিদ্রোহী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বিদ্রোহী ছিলেন, যেমন বিদ্রোহী ছিলেন নজরুল। তাঁর সমগ্র জীবনধারা মার্ক্সবাদের সেই শাশ্বত বাণীকেই প্রতিধ্বনিত করে: 'বিদ্রোহ ন্যায়সংগত'।

মওলানা ভাসানী চলে গেছেন। কিন্তু তিনি পেছনে রেখে গেছেন তারুণ্য, আশা এবং সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের এক অসামান্য জীবনস্মৃতি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে।

Tags: politics maulana bhashani tarunnya sangram imperialism feudalism peasant leader bangladesh history ideology revolutionary