ইউরোপের জৌলুসপূর্ণ জীবনের হাতছানি আর পরিবারের ভাগ্য ফেরানোর স্বপ্ন এখন ভূমধ্যসাগরের লোনা জলে বিলীন। অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে সাগরে ট্রলারডুবিতে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার দুই তরতাজা যুবকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় একই এলাকার আরও ছয় যুবক নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) লিবিয়ার আল খুমজ উপকূলীয় অঞ্চলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটলেও বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর থেকেই গোপালগঞ্জের ওই গ্রামগুলোতে চলছে শোকের মাতম।
দালাল চক্র ও মরণফাঁদ: স্বপ্নের অপমৃত্যু
নিহতরা হলেন—মুকসুদপুর উপজেলার ননীক্ষির ইউনিয়নের পশ্চিম লওখণ্ডা গ্রামের জাহিদ শেখের ছেলে আনিস শেখ এবং আকোব আলী শেখের ছেলে এনামুল শেখ।
নিহতের পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে Illegal Migration বা অবৈধ অভিবাসনের পথ বেছে নিয়েছিলেন এই যুবকরা। গত ১৩ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) দিবাগত রাতে লিবিয়ার আল খুমজ উপকূল থেকে একটি ট্রলারে করে তারা ইতালির উদ্দেশ্যে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেন। মাঝসমুদ্রে লিবিয়ান Coast Guard-এর টহল দল তাদের ধাওয়া করলে ট্রলারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় এবং ডুবে যায়। ঘটনাস্থলেই সলিলসমাধি ঘটে আনিস ও এনামুলের।
নিখোঁজদের তালিকায় দীর্ঘশ্বাস
ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ থাকা ছয় যুবকের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন—পশ্চিম লওখণ্ডা গ্রামের আওলাদ শেখের ছেলে ইব্রাহিম শেখ, হায়দার শেখের ছেলে ধলা শেখ, ইকরাম মীনার ছেলে দুলাল মীনা, হায়দার মীনার ছেলে আশিক মীনা, খালেক মোল্যার ছেলে সোহেল মোল্যা এবং কাশালিয়া ইউনিয়নের গুনহর গ্রামের হাফিজ মীনার ছেলে নিয়াজ মীনা। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, যা স্বজনদের উদ্বেগ বা Anxiety আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২১ লাখ টাকায় কেনা মৃত্যু: বাবার আর্তনাদ
সন্তানহারা পিতা আকোব আলী শেখের আহাজারিতে বৃহস্পতিবার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘‘মাদারীপুরের দালাল এনামুলের মাধ্যমে এক মাস আগে ছেলেকে লিবিয়া পাঠিয়েছিলাম। জমি বিক্রি আর ধারদেনা করে মোট ২১ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলাম দালালের হাতে। কথা ছিল নিরাপদে ইতালি পৌঁছে দেবে। কিন্তু ২১ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার ছেলে লাশ হলো।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘দালালের লোভ আর মিথ্যা আশ্বাস আমার কোল খালি করে দিল। এখন আমার একটাই চাওয়া, সরকার যেন আমার ছেলের লাশটা দেশে আনার বা Repatriation-এর ব্যবস্থা করে। শেষবারের মতো ছেলের মুখটা দেখতে চাই।’’
শোকে স্তব্ধ জনপদ
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে পশ্চিম লওখণ্ডা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সন্তান ও স্বজনদের হারিয়ে পরিবারগুলো এখন বাকরুদ্ধ। Human Trafficking বা মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে এভাবে আর কত প্রাণ ঝরবে, সেই প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। এলাকাবাসী অভিযুক্ত দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।