বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বয়ান উঠে এল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কণ্ঠে। তিনি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন মেজর ও পরবর্তী সময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সেনাবাহিনীর অবদান চিরকাল ‘স্বর্ণাক্ষরে’ লেখা থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইতিহাসের দায়মুক্তি ও জিয়ার স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বয়ানের বেড়াজালে আটকে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা এদিন অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।” ড. ইউনূসের এই বক্তব্য জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ Historical Recognition বা স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তিনি আরও স্মরণ করেন, একাত্তরের ২১ নভেম্বর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর যে Joint Operation বা যৌথ আক্রমণ চালিয়েছিল, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য ‘মাইলফলক’। তিনি বলেন, “আমাদের এই বীর সেনারা যদি সেদিন বিজয় ছিনিয়ে না আনতেন, তবে তাদের মৃত্যুদণ্ড ছিল অনিবার্য। নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, পরিবারের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে তারা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।”
নির্বাচন ও আগামীর বাংলাদেশ
ভাষণে ড. ইউনূস কেবল ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং জাতির সামনে তুলে ধরেছেন আগামীর Roadmap। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা শীঘ্রই একটি নির্বাচনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। আমাদের স্বপ্ন—এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই আমরা এক ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর পথে যাত্রা শুরু করব।”
নির্বাচন যাতে সর্বাঙ্গসুন্দর, আনন্দমুখর ও উৎসবমুখর হয়, সে বিষয়ে সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “বাংলাদেশের Democratic Transition বা গণতান্ত্রিক উত্তরণে আসন্ন নির্বাচন হবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।” এই প্রক্রিয়ায় সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের সর্বোচ্চ Professionalism বা পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আধুনিকায়ন
শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী হলেও, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, “যেকোনো আগ্রাসী শক্তির মোকাবিলায় আমাদের সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।”
সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বিগত ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “বিগত আমলে সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা উন্নয়ন ও Modernization-কে উপেক্ষা করা হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে Global Standard বা বৈশ্বিক মানের প্রযুক্তি সংযোজন ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।” এছাড়া দেশগঠন ও জনকল্যাণে ছাত্র-যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে বিএনসিসি (BNCC)-এর কার্যক্রম বহুগুণ বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি।
চব্বিশের অভ্যুত্থান ও আস্থার প্রতীক
একাত্তরের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, “দেশের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি জাতিগঠন ও যেকোনো National Crisis বা জাতীয় দুর্যোগে সশস্ত্র বাহিনী সবসময়ই জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশ পুনর্গঠন ও সংস্কার কার্যক্রমেও সশস্ত্র বাহিনী মানুষের আস্থার প্রতিদান দিচ্ছে।”
বিশ্বমঞ্চে শান্তির দূত
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, গত ৩৭ বছরে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা ৪৩টি দেশে সফলভাবে ৬৩টি মিশন সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ১০টি মিশনে তারা Global Peace and Security রক্ষায় কাজ করছেন। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নারী শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে।
অনুষ্ঠানের শেষে ড. ইউনূস একাত্তরের বীর শহীদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।