সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হওয়া পরপর কয়েকটি ভূমিকম্পের ঘটনায় প্রবল আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক শিক্ষার্থীরা। শতবর্ষী এই প্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ হলগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম Panic বা ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণার জোর দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।
শনিবার (২২ নভেম্বর) রাতে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ স্বাক্ষরিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।
‘মৃত্যুঝুঁকি’ নিয়ে ক্লাসে ফেরা নিষ্ঠুরতার শামিল
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ তার বিবৃতিতে বলেন, “পরপর দুটি ভূমিকম্পের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরা চরম আতঙ্ক ও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। হলগুলোর বর্তমান যা অবস্থা, তাতে বড় কোনো দুর্যোগে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে জোরপূর্বক ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণ করা কার্যত নিষ্ঠুরতার শামিল।”
বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ‘স্ট্রাকচারাল অডিট’ ও জরুরি সংস্কার
বিবৃতিতে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধই নয়, বরং সংকট নিরসনে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও কারিগরি সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরেছে ডাকসু। দাবি জানানো হয়েছে, অবিলম্বে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিশেষজ্ঞ ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টেকনিক্যাল টিম গঠন করতে হবে।
ফরহাদ বলেন, “এই বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে প্রতিটি আবাসিক হলের ভবন সরেজমিনে পরিদর্শন করে Structural Risk Assessment বা কাঠামোগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। এবং স্বচ্ছতার স্বার্থে সেই Audit Report বা প্রতিবেদন প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।”
ডাকসুর দাবি অনুযায়ী, মূল্যায়নে যেসব ভবন বা সুনির্দিষ্ট কক্ষ Vulnerable বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হবে, সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করতে হবে এবং সেখানে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের দ্রুততম সময়ে নিরাপদ স্থানে বা বিকল্প আবাসনে স্থানান্তর করতে হবে। একইসঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর দ্রুত সংস্কার বা Retrofitting নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
সেশনজট এড়াতে ‘অনলাইন ক্লাস’-এর প্রস্তাব
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি বা Session Jam-এর কবলে পড়ার যে আশঙ্কা থাকে, তা নিরসনেও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে ডাকসু। জিএস ফরহাদ বলেন, “মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। তবে এই সময়ে শিক্ষার্থীরা যাতে সেশনজটে না পড়ে, সেজন্য আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে Online Class বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে হবে।”
এছাড়া, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এবং বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় খুলে দেওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থগিত হওয়া পরীক্ষাসমূহ সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের প্রতি কঠোর আল্টিমেটাম
বিবৃতির শেষ অংশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ডাকসু সাধারণ সম্পাদক। তিনি উল্লেখ করেন, প্রশাসন যদি শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে এবং এই যৌক্তিক দাবি মেনে প্রয়োজনীয় ‘ইমার্জেন্সি প্রটোকল’ বা জরুরি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ডাকসু কঠোর আন্দোলনে নামবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে বাধ্য করা হবে বলেও তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান।