আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে কর্মজীবী মানুষের ব্যস্ততার অন্ত নেই। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা জীবনে খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আর এই ব্যস্ত ‘লাইফস্টাইল’-এ চটজলদি পুষ্টির জোগান দিতে ডিমের জুড়ি মেলা ভার। সকালের নাস্তা থেকে রাতের ডিনার—সহজলভ্য এই আমিষ জাতীয় খাবারটি আমাদের খাদ্যতালিকায় অপরিহার্য।
তবে ডিম নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। স্বাস্থ্যসচেতন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—রোজ ডিম খাওয়া কি আদৌ নিরাপদ? কেউ কেউ মনে করেন, নিয়মিত ডিম খেলে রক্তে চর্বি বা ‘কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা বেড়ে যায়, যা ডেকে আনে হৃদরোগের ঝুঁকি ও অকাল বার্ধক্য। আবার ওজন বৃদ্ধির ভয়েও অনেকে ডিম এড়িয়ে চলেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক গবেষণা কী বলছে? আসুন, বিজ্ঞানের আলোকে জেনে নেওয়া যাক রোজ ডিম খাওয়ার প্রকৃত সত্য।
পুষ্টির পাওয়ারহাউজ নাকি ভয়ের কারণ?
ডিমকে বলা হয় প্রকৃতির ‘মাল্টিভিটামিন’। একটি ছোট ডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ‘প্রোটিন’ এবং ‘নিউট্রিয়েন্টস’ বা পুষ্টিকর উপাদান। এতে থাকা ক্যালসিয়াম হাড় মজবুত করে এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। পুষ্টিবিদদের মতে, ডিমে যে কোলেস্টেরল থাকে, তা আসলে আমাদের শরীরে ‘গুড কোলেস্টেরল’ তৈরিতে সহায়তা করে। তবে সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে।
গবেষণা কী বলছে: ঝুঁকি বনাম উপকারিতা
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রায় ২ হাজার ৯০০ জন মানুষের ওপর দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে তিনটি অথবা তার বেশি ডিম খান অথবা প্রতিদিন ৩০০ মিলিগ্রামের বেশি ‘ডায়েটারি কোলেস্টেরল’ গ্রহণ করেন, তাদের হৃদপিণ্ডের সমস্যায় ভোগার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় ৩.২ শতাংশ বেশি। এমনকি অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিও ৪.৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে গবেষকরা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ডিসক্লেইমার’ বা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু ডিম খাওয়ার কারণেই যে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে, তা নয়। এর সঙ্গে ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং শরীরচর্চা বা ‘এক্সারসাইজ’ না করার মতো বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থাৎ, সুস্থ থাকতে হলে কেবল ডিম বর্জন করলেই হবে না, পরিবর্তন আনতে হবে সামগ্রিক জীবনযাত্রায়।
ডিম খাওয়ার সঠিক নিয়ম ও ‘ম্যাজিক’ টিপস
পুষ্টিগুণ পুরোপুরি পেতে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে ডিম খাওয়ার পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যারা ‘ডায়াবেটিস’ বা সুগারের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ কিছু টিপস:
ভিনেগার থেরাপি: সিদ্ধ ডিম খাওয়ার আগের দিন রাতে তা ভিনেগারে ভিজিয়ে রাখতে পারেন। সারারাত ভিনেগারে ভেজানোর পর সকালে সেই ডিম খেলে হজম ও পুষ্টির শোষণে বিশেষ উপকার পাওয়া যায় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
দারুচিনির ব্যবহার: রক্তে সুগারের মাত্রা বা ‘ইনসুলিন লেভেল’ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দারুচিনি অত্যন্ত কার্যকরী। ডায়াবেটিস রোগীরা সিদ্ধ ডিমের ওপর সামান্য দারুচিনির গুঁড়া ছিটিয়ে খেলে একদিকে যেমন স্বাদ বাড়বে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমবে।
শেষ কথা: সংযমেই সুস্থতা
ডিম নিঃসন্দেহে পুষ্টিকর, তবে তা খেতে হবে পরিমাণমতো। সুস্থ মানুষের জন্য দিনে একটি ডিম নিরাপদ হলেও, যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা রয়েছে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত। কোলেস্টেরলের ঘাটতি পূরণ ও সুস্বাস্থ্যের জন্য ডিম খাওয়া বন্ধ না করে, বরং সঠিক নিয়মে ও পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।