আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে ‘ঘাড় ব্যথা’ এখন যেন এক নিত্যসঙ্গী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ল্যাপটপের সামনে ঘাড় গুঁজে কাজ, কিংবা বাড়ি ফিরে দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিমায় টিভি দেখা—এই অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে অজান্তেই আমরা ঘাড়ের বারোটা বাজাচ্ছি। করপোরেট দুনিয়ায় একে বলা হচ্ছে ‘টেক-নেক’ বা ‘ডেস্ক-নেক সিন্ড্রোম’। সাময়িক ব্যথা মনে করে অনেকেই একে অবহেলা করেন, কিন্তু চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন—এই অবহেলাই ডেকে আনতে পারে বড়সড় বিপদ, এমনকি অস্ত্রোপচারের টেবিলে পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে আপনাকে।
একটানা কাজ করা উচিত নয়—এই স্বাস্থ্যবিধি আমরা সবাই জানি, কিন্তু মানতে পারি কয়জন? কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ বা ‘ডেডলাইন’ সামলাতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকা ছাড়া চাকুরিজীবীদের যেন উপায় নেই। তবে ঘাড় ব্যথার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন হলে এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
নিত্যদিনের অভ্যাস নাকি বড় অসুখ?
ঘাড় ব্যথার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা আঙুল তুলছেন আমাদের দৈনন্দিন ‘লাইফস্টাইল’ বা জীবনযাত্রার দিকে। একটানা এক জায়গায় বসে কাজ করা, কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকা বা দীর্ঘক্ষণ স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে ঘাড়ের মাংসপেশি ও লিগামেন্টের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। এছাড়া রাতে শোয়ার সময় খুব উঁচু বালিশ ব্যবহার করা বা ভুল দেহভঙ্গিতে (Posture) শোয়াও ঘাড় ব্যথার অন্যতম কারণ। শুরুতে এটি হালকা অস্বস্তি তৈরি করলেও ধীরে ধীরে তা তীব্র আকার ধারণ করে এবং দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটায়।
স্নায়ু ও মাংসপেশির ওপর গোপন অত্যাচার
ঘাড় বা ‘সারভাইকাল স্পাইন’ হলো আমাদের শরীরের অন্যতম সংবেদনশীল অংশ, যার সঙ্গে সরাসরি মস্তিষ্কের সংযোগ রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ঘাড়ের ব্যথার পেছনে কেবল ক্লান্তি নয়, নার্ভের বা স্নায়ুর সমস্যাও দায়ী হতে পারে।
নার্ভের জটিলতা: স্পাইনাল কর্ড বা মেরুদণ্ড থেকে বেরিয়ে আসা কোনো স্নায়ুতে চাপ পড়লে বা ‘নার্ভ কমপ্রেশন’ হলে ঘাড়ে তীব্র ব্যথা হতে পারে। এটি অনেক সময় ঘাড় থেকে হাতে ছড়িয়ে পড়ে।
মাংসপেশির জড়তা: দীর্ঘদিন ধরে ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ বা ‘স্ট্রেস’ দেওয়ার ফলে মাংসপেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং শক্ত (Stiff) হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘মাসল স্পাজম’। এর ফলে ঘাড় ঘোরানো বা নাড়াচাড়া করা কষ্টকর হয়ে ওঠে।
পুরানো আঘাত ও সংক্রমণের ঝুঁকি
অনেক সময় আমরা ছোটখাটো আঘাতকে গুরুত্ব দিই না। অতীতে কোনো খেলাধুলা বা দুর্ঘটনার সময় ঘাড়ে পাওয়া আঘাত বা ‘ইনজুরি’ তাৎক্ষণিকভাবে সেরে গেলেও, বছর কয়েক পরে তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এছাড়া বিরল ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডে সংক্রমণ (Infection) বা ঘাড়ের হাড়ের ক্ষয়জনিত সমস্যা থেকেও ব্যথার উৎপত্তি হতে পারে। হাড়ের ডিস্ক সরে যাওয়া বা ‘স্লিপ ডিস্ক’-এর মতো ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়।
মানসিক চাপ: অদৃশ্য শত্রু
শুনতে অবাক লাগলেও, ঘাড় ব্যথার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ (Stress), উদ্বেগ বা ‘অ্যাংজাইটি’ আমাদের শরীরের মাংসপেশিগুলোকে অবচেতনভাবেই সংকুচিত করে রাখে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে ঘাড় ও কাঁধের ওপর। এছাড়া দীর্ঘদিনের অনিদ্রা বা ঘুমের অভাব শরীরকে বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত করে, যা ঘাড়ের ব্যথাকে আরও উসকে দেয়।
স্বস্তি পেতে যা করবেন
ঘাড় ব্যথাকে প্রশমিত করতে এবং বড় বিপদ এড়াতে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি: ১. বিরতি নিন: কাজের ফাঁকে প্রতি ৩০-৪০ মিনিট অন্তর ৫ মিনিটের বিরতি নিন। ঘাড় ডানে-বামে এবং ওপর-নিচে ঘোরানোর হালকা ব্যায়াম করুন। ২. সঠিক দেহভঙ্গি: কম্পিউটারে কাজ করার সময় মনিটর যেন চোখের সোজাসুজি থাকে (Eye Level), সেদিকে খেয়াল রাখুন। মেরুদণ্ড সোজা রেখে বসার অভ্যাস করুন। ৩. সেক ও ম্যাসাজ: ব্যথা তীব্র হলে গরম বা ঠান্ডা সেক (Hot or Cold Compress) সাময়িক আরাম দিতে পারে। তবে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ৪. বালিশ ও বিছানা: ঘুমানোর সময় খুব শক্ত বা খুব নরম বালিশ ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। ঘাড় ও মেরুদণ্ড যেন সমান্তরালে থাকে, তা নিশ্চিত করুন।