শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই ফের বিষিয়ে উঠতে শুরু করেছে মেগাসিটি ঢাকার বাতাস। কিছুদিন আগেও নগরীর বায়ুমানে কিছুটা উন্নতির আভাস মিললেও, এখন পরিস্থিতি আবারও সংকটপূর্ণ। ধুলিকণা আর ধোঁয়ার চাদরে ঢাকা পড়েছে রাজধানী, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য সৃষ্টি করছে ভয়াবহ হুমকি। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, দূষণের মাত্রায় বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর তালিকায় আবারও ওপরের দিকে উঠে এসেছে ঢাকা।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার (IQAir)-এর লাইভ ডেটা অনুযায়ী, দূষিত শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থান দখল করেছে বাংলাদেশের রাজধানী। এ সময় ঢাকার ‘Air Quality Index’ (AQI) স্কোর ছিল ২৬৪, যা বাতাসের মান হিসেবে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ (Very Unhealthy) বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
শীর্ষে লাহোর, ঢাকার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে দিল্লি
আইকিউএয়ারের পরিসংখ্যান বলছে, উপমহাদেশের বাতাস এখন রীতিমতো বিষাক্ত। ৪০৮ স্কোর নিয়ে দূষণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর শহর। লাহোরের বাতাসের মান ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘Hazardous’ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বসবাসের জন্য চরম অযোগ্য।
তালিকায় ঢাকার ঠিক পরেই, অর্থাৎ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। তাদের স্কোর ২৪৯। ২১৮ স্কোর নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ভারতেরই আরেক শহর কলকাতা এবং ২১১ স্কোর নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে মিশরের কায়রো। উল্লেখ্য, ঢাকার স্কোর ২৬৪ হওয়ার অর্থ হলো, দিল্লির চেয়েও ঢাকার বাতাস বর্তমানে মানবদেহের জন্য বেশি ক্ষতিকর।
একিউআই স্কোর: সংখ্যার পেছনের বিপদ
বায়ুদূষণের মাত্রা বোঝার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে একিউআই (AQI) বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ব্যবহার করা হয়। এই স্কোরের ভিত্তিতে বাতাসের মানকে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়:
০ থেকে ৫০: ‘ভালো’ (Good)।
৫১ থেকে ১০০: ‘মাঝারি’ (Moderate), যা গ্রহণযোগ্য।
১০১ থেকে ১৫০: ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ (Unhealthy for Sensitive Groups)।
১৫১ থেকে ২০০: ‘অস্বাস্থ্যকর’ (Unhealthy)।
২০১ থেকে ৩০০: ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ (Very Unhealthy)।
৩০১ থেকে ৪০০: ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (Hazardous), যা জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতার আওতাভুক্ত।
ঢাকার বর্তমান স্কোর (২৬৪) ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ জোনে অবস্থান করছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মাত্রার দূষণ দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস, হৃদরোগ এবং শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করণীয়
শহরের এই ‘Critical Situation’-এ চিকিৎসকরা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন। বায়ুমান ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় থাকলে শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের (বিশেষ করে যারা অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন) ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। সুস্থ মানুষদেরও বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা এবং দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে ভারী পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শুষ্ক মৌসুমে সাধারণত নির্মাণকাজ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং ইটভাটার দূষণের কারণে ঢাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা ছাড়া এই ‘Silent Killer’ বা নীরব ঘাতক থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।