প্রশাসনিক ক্ষমতার নজিরবিহীন অপব্যবহার এবং দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং প্রশাসনের ১৩ জন শীর্ষস্থানীয় সাবেক সচিবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাষ্ট্রীয় জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সাধারণ মানুষকে পুনর্বাসনের নামে জমি অধিগ্রহণ করে, সেই জমিতে নিজেদের জন্য বিলাসবহুল আবাসন গড়ে তোলার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) দুদকের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম বাদী হয়ে এই হাই-প্রোফাইল মামলাটি দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন। একসঙ্গে এতজন সাবেক শীর্ষ আমলার বিরুদ্ধে মামলার ঘটনা প্রশাসনের অন্দরমহলে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
‘পুনর্বাসনে’র জমিতে কর্মকর্তাদের বিলাসিতা: দুর্নীতির নীল নকশা
দুদকের এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রজেক্ট’-এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে সরকারি গেজেট মূলে ৪০ একর জমি অধিগ্রহণ (Land Acquisition) করে। কথা ছিল, এই জমিতে ভিটেমাটি হারানো মানুষদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে মূল গেজেটের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বদলে সেই জমি বেআইনিভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সেখানে ফ্ল্যাট নির্মাণ এবং ৯৯ বছরের দীর্ঘমেয়াদি লিজ (Long-term Lease) প্রদানের মাধ্যমে এক নজিরবিহীন দুর্নীতির নজির স্থাপন করা হয়। দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন জানান, আইন বহির্ভূতভাবে এই প্রকল্প গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম অপব্যবহার করেছেন।
অভিযুক্তদের হাই-প্রোফাইল তালিকা
মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা গত সরকারের আমলে প্রশাসনের অত্যন্ত প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক ছিলেন। ওবায়দুল কাদের ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছেন একাধিক সাবেক সিনিয়র সচিব ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের প্রধানরা। আসামিরা হলেন:
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সেতু বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সচিব কামাল উদ্দীন আহমদ, সাবেক বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আব্দুল জলিল, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. জাফর আহমেদ খান, সাবেক সিএএজি ও সোনালী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সংসদ বিষয়ক বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক মিজ জুয়েনা আজিজ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আযম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আখতার হোসেন ভূঁইয়া এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের সাবেক সচিব ড. আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।
ইলিয়াস মোল্লার বিরুদ্ধেও সম্পদের পাহাড় ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ
এদিকে একই দিনে ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে দুদক। তাদের বিরুদ্ধে সাড়ে ১৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৮১ কোটি টাকার বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের (Suspicious Transaction) অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দুদক মহাপরিচালক জানান, প্রাথমিক তদন্তে এই বিপুল অংকের গরমিল পাওয়া গেছে। তদন্ত চলাকালীন আরও নতুন কোনো সম্পদের তথ্য বা মানি লন্ডারিংয়ের (Money Laundering) প্রমাণ পাওয়া গেলে তা চার্জশিটে (Charge Sheet) অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দুর্নীতিবিরোধী এই সাঁড়াশি অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।