রাজধানীর পল্টনে প্রকাশ্য দিবালোকে হার মানাল সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। জুমার নামাজের পর ব্যস্ত নগরীর বুকে ‘Target Killing’ (পরিকল্পিত হত্যা)-এর আদলে গুলিবিদ্ধ হলেন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় সংঘটিত এই বর্বরোচিত হামলায় বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (DMCH) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন।
‘হিট অ্যান্ড রান’: মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরা ‘শুটার’
প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং পরিকল্পিতভাবে। দুপুর আড়াইটার দিকে ফকিরাপুল কালভার্ট রোড দিয়ে একটি রিকশায় করে যাচ্ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি ও তার এক সহযোগী। ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি মোটরসাইকেল তাদের রিকশার পিছু নেয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাইকে থাকা দুই আরোহীই ছিলেন হেলমেট পরিহিত। তারা রিকশার সমান্তরালে এসে ‘Running Position’ থেকেই হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। খুব কাছ থেকে বা ‘Point Blank Range’ থেকে চালানো এই হামলায় গুলিটি সরাসরি হাদির মাথায় বিদ্ধ হয়। গুলি করার পরপরই দুর্বৃত্তরা দ্রুতগতিতে বাইক চালিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে পালিয়ে যায়।
আতঙ্ক, চিৎকার এবং রক্তস্রোত
গুলির বিকট শব্দে শুক্রবার দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে মুহূর্তেই বক্স কালভার্ট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রথমে অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি কী ঘটেছে। রিকশায় থাকা হাদির সহযোগী যখন “বাঁচাও বাঁচাও, গুলি লেগেছে” বলে আর্তনাদ শুরু করেন, তখনই আশপাশের মানুষ ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পারেন।
রক্তাক্ত অবস্থায় হাদি রিকশায় ঢলে পড়েন। তার মাথা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। স্থানীয় জনতা এবং সহযোগীরা কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাদির অবস্থা অত্যন্ত ‘Critical’ (আশঙ্কাজনক)। বর্তমানে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন, এবং তার জীবন বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও হাসপাতালে ভিড়
খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঢামেক হাসপাতালে ছুটে আসেন হাদির স্বজন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহযোদ্ধারা। হাসপাতালের করিডোরে স্বজনদের কান্না আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষোভে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। সহযোদ্ধাদের দাবি, এটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং হাদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ‘Assassination Attempt’ (হত্যাচেষ্টা)। তারা অবিলম্বে এই ঘটনার নেপথ্য নায়কদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তির ব্যবহার: মাঠে যৌথ বাহিনী
ঘটনার পরপরই পল্টনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এলাকাটি ঘিরে ‘Crime Scene’ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীদের শনাক্ত করতে আশপাশের ভবনের ‘CCTV Footage’ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং অত্যাধুনিক ‘Surveillance Technology’ ব্যবহার করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট এবং শুটারদের গতিপথ চিহ্নিত করতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, হামলাকারী যে বা যারাই হোক, তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হবে।
রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে এমন সাহসিকতার সঙ্গে গুলি চালানোর ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধছে নতুন প্রশ্ন।