ভোরের আলো ফোটার আগেই আতঙ্ক, ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিস্থিতি। ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাবুবাজার এলাকায় একটি বহুতল ‘মার্কেট কাম আবাসিক’ ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বড় ধরণের বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হলেও, উদ্ধারকর্মীদের তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপে রক্ষা পেয়েছে বহু প্রাণ। আগুনের উৎস ভবনের বেজমেন্টে থাকা পাটের গুদাম বলে নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) ভোর ৫টা ৩৭ মিনিটে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের একাধিক ইউনিট। আগুনের তীব্রতা এবং ভবনের ধরণ বিবেচনায় একে একে ১৪টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে স্থানীয় প্রশাসনের অনুরোধে উদ্ধারকার্যে সহায়তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-র সদস্যদের।
ধোঁয়ার কুণ্ডলী ও শ্বাসরূদ্ধকর উদ্ধার অভিযান
আগুন লাগা ভবনটি মিশ্র প্রকৃতির। এর নিচতলায় এবং বেজমেন্টে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চললেও ওপরের তলাগুলোতে ছিল মানুষের বসবাস। আগুনের শিখার চেয়ে ধোঁয়ার ভয়াবহতা উদ্ধারকাজকে বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “আগুন লাগার খবর পেয়েই আমাদের কর্মীরা সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে কাজ শুরু করে। ভবনের ভেতরে আটকে পড়া বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই ছিল আমাদের ‘ফার্স্ট প্রায়োরিটি’। অত্যন্ত ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যেও আমাদের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৪২ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন।”
আগুনের উৎস ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রাথমিক তদন্ত ও পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, ভবনের Basement-এ অবস্থিত একটি পাটের গোডাউন (Jute Godown) থেকেই আগুনের সূত্রপাত। পাট দাহ্য পদার্থ হওয়ায় আগুন দ্রুত ধোঁয়ার সৃষ্টি করে এবং ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম উদ্ধার অভিযানের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলেন, “বেজমেন্টে ঢোকার পথগুলো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। আগুনের উৎসে পৌঁছাতে আমাদের প্রতিটি সাটার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, আমরা আগুনকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ (Contain) করতে পেরেছি। পাশের ভবনগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এখন নেই বললেই চলে।”
কেমিক্যাল বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি নেই
পুরান ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় অগ্নিকাণ্ড মানেই কেমিক্যালের ভয়াবহতার স্মৃতি। তবে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আশ্বস্ত করেছেন যে, এই ভবনে কোনো প্রকার দাহ্য রাসায়নিক বা Chemical-এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়াও বিস্ফোরণের কোনো আলামতও প্রাথমিক তল্লাশিতে মেলেনি। মূলত পোশাক ও পাটের মতো পণ্য থাকায় ধোঁয়ার প্রকোপ বেশি।
বর্তমানে সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং ফায়ার সার্ভিসের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ এবং ‘ড্যাম্পিং’ (Damping) প্রক্রিয়ার কাজ চলছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তীতে নিশ্চিত করা হবে।