ফুটবল ঈশ্বরের আগমনে তিলোত্তমা সেজেছিল নতুন রূপে, কিন্তু সেই উৎসবের আমেজ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল প্রশাসনিক ব্যর্থতার কালো ছায়ায়। বিশ্ব ফুটবলের মেগাস্টার লিওনেল মেসিকে এক ঝলক দেখার জন্য সল্টলেক যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যারা মোটা অঙ্কের টিকিট কেটে ভিড় জমিয়েছিলেন, তাদের স্বপ্নভঙ্গ আর ক্ষোভের আগুন শেষ পর্যন্ত আছড়ে পড়ল রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে। শনিবারের লজ্জাজনক Security Breach ও দর্শক অসন্তোষের দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করলেন পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস।
মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) রাজ্য প্রশাসনের সদর দপ্তর নবান্ন থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অরূপ বিশ্বাসের Resignation Letter বা পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। শুধু তাই নয়, রাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া এই ঘটনার পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ক্রীড়ামন্ত্রীর বিদায় ও তদন্তের নির্দেশ
মেসি-বরণের আয়োজনে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ক্রীড়ামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠছিল। প্রবল জনরোষ ও সমালোচনার মুখে গত সোমবারই (১৫ ডিসেম্বর) পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন অরূপ বিশ্বাস। তবে তিনি কেবল ক্রীড়া দপ্তরের দায়িত্ব ছেড়েছেন; যুবকল্যাণ, আবাসন ও বিদ্যুৎ মন্ত্রীর Portfolio বা দায়িত্ব তিনি আগের মতোই পালন করবেন।
পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্রীড়া দপ্তর অন্য কোনো মন্ত্রীর হাতে দেওয়া হবে না। তিনি নিজেই এই দপ্তরের তদারকি করবেন। ঘটনার গভীরে যেতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের নেতৃত্বে একটি High-level Inquiry Committee গঠন করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমাও চেয়েছেন।
কী ঘটেছিল শনিবারের সেই দুপুরে?
লিওনেল মেসির দ্বিতীয়বার কলকাতা সফর ঘিরে উন্মাদনার পারদ ছিল তুঙ্গে। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ মেসির কনভয় যখন যুবভারতীতে প্রবেশ করে, তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু বিপত্তি বাধে Crowd Management-এর ভয়াবহ ব্যর্থতায়। অভিযোগ ওঠে, সাধারণ দর্শকরা চড়া দামে টিকিট কিনলেও মন্ত্রী, আমলা ও ভিআইপিদের ভিড়ে মেসিকে একনজর দেখার সুযোগ পাননি তারা। মেসিকে ঘিরে রেখেছিল নেতা-কর্মীদের এমন এক বলয়, যা সাধারণ দর্শকদের দৃষ্টিসীমা সম্পূর্ণ আড়াল করে দেয়।
স্টেডিয়ামে তাণ্ডব ও পুলিশের লাঠিচার্জ
সহ্যের বাঁধ ভাঙতেই গ্যালারি জুড়ে শুরু হয় 'উই ওয়ান্ট মেসি' স্লোগান। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ জনতা ব্যারিকেড ও প্রাচীর ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়ে। শুরু হয় ব্যাপক Vandalism। গোলপোস্টের জাল ছিঁড়ে ফেলা হয়, প্লেয়ার্স টানেলের ছাউনি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠে নামানো হয় র্যাফ (RAF), একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়।
স্টেডিয়ামের এই বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের দৃশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও নেতিবাচক শিরোনাম হয়েছে। ঘটনার দিনই অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ। ফুটবল পাগল বাঙালির আবেগের মঞ্চে এমন প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা রাজ্যের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রইল।