মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিরতার প্রভাব আবারও আছড়ে পড়ল বাংলাদেশের জলসীমায়। টেকনাফের সেন্টমার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকাসহ ৯ জন বাংলাদেশি জেলেকে অপহরণ করেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (Arakan Army)। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) সকাল ৯টার দিকে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের গভীর সমুদ্র থেকে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
মাঝসাগরে স্পিড বোটের তাড়া ও অপহরণ
শাহপরীর দ্বীপ বোট মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল গফুর জানান, প্রতিদিনের মতো নিয়মিত মাছ শিকারে গিয়েছিলেন জেলেরা। সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানকালে হঠাৎ মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা আরাকান আর্মির সদস্যরা শক্তিশালী স্পিড বোট (Speed Boat) নিয়ে জেলেদের ধাওয়া করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে মিয়ানমার সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
অপহৃত ৯ জেলের পরিচয়
নিখোঁজ হওয়া জেলেরা সবাই টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ মাঝের পাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন— মো. আনোয়ার (৩০), মো. ইব্রাহিম (১৯), মনজুর আলম (৩৫), ওমর ফারুক (২০), কবির আহমেদ (৫৫), জাফর আলম (২০), মো. জসিম (১৮), মোহাম্মদ রাশেল (৩০) এবং মো. আব্দুল্লাহ (৩০)। এদের মধ্যে দুটি নৌকার মালিক যথাক্রমে ইউসুফ জালাল এবং লালু ফকির।
আরাকান আর্মির দাবি ও ছবি প্রকাশ
মিয়ানমারের রাখাইনভিত্তিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম 'আরাকান বে নিউজ' (Arakan Bay News) অপহৃত জেলেদের ছবি প্রকাশ করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ওই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরাকান আর্মি দাবি করেছে, অবৈধভাবে আরাকানের জলসীমায় (Maritime Boundary) প্রবেশ করে মাছ ধরার অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি জানিয়েছে।
বিপন্ন উপকূলীয় জীবন ও জীবিকা
এই ঘটনার পর টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, "আমাদের এলাকার জেলেরা এখন সাগরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। বারবার এমন ঘটনায় জেলে ও ট্রলার মালিকদের মধ্যে আর্থিক ধস নামার উপক্রম হয়েছে।" বোট মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল গফুর এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ এবং বিজিবি (BGB) ও কোস্টগার্ডের কড়া টহল দাবি করেছেন।
পরিসংখ্যানে ভয়ার্ত সীমান্ত পরিস্থিতি
ট্রলার মালিক ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে আরাকান আর্মি কর্তৃক অপহরণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে মোট ৩২৮ জন জেলেকে অপহরণ করেছে তারা। বিজিবির কূটনৈতিক তৎপরতায় কয়েক দফায় ১৮৯ জন জেলে এবং ২৭টি ট্রলার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, এখনও মিয়ানমারের কারাগারে বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হেফাজতে ১৭২ জন জেলে এবং ২৬টি ট্রলার বন্দি অবস্থায় রয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বেপরোয়া মনোভাবের কারণে সেন্টমার্টিন ও টেকনাফ সংলগ্ন সমুদ্রসীমায় নিরাপত্তা সংকট (Security Crisis) প্রকট হচ্ছে, যা সরাসরি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি (Blue Economy) এবং প্রান্তিক জেলেদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।