দেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) নির্ধারিত এই আকাশছোঁয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমানে চরম হিমশিম খাচ্ছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের (Fiscal Year) প্রথম পাঁচ মাসে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি (Growth) ধরে রেখে ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হলেও, লক্ষ্যপূরণে বাকি সাত মাসে আরও প্রায় ৭০ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা রাজস্ব প্রয়োজন। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তৈরি হয়েছে সংশয় ও সম্ভাবনা।
লক্ষ্যমাত্রা ও বর্তমান চিত্র: পরিসংখ্যানের সমীকরণ
অর্থবছরের শুরুতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের জন্য ৯২ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে তা সংশোধন করে ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। কাস্টমসের তথ্যমতে, নভেম্বর পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে শুল্ক সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ৬৮ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, যা ছিল তৎকালীন সময়ের একটি রেকর্ড। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিভাগটি।
আমদানির জোয়ার: ভরসা যখন রমজান ও শিল্প
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের (Market Value) ৪ কোটি ১০ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে ১২.৭১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং জ্বালানি তেল ও শিল্পের কাঁচামাল (Raw Materials) আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শুল্ক কর্মকর্তাদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত পণ্যের যথাযথ শুল্কায়ন করা সম্ভব হলে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়া যাবে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ: বিড়ম্বনা ও সার্ভার জটিলতা
রাজস্ব আদায়ের এই কঠিন মিশনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বারবার ‘সার্ভার ডাউন’ হওয়ার সমস্যা। ডিজিটাল এই যুগে কাস্টমসের অটোমেশন প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে পণ্য ছাড়করণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে রাজস্ব সংগ্রহে।
পিএইচপি গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, “আমাদের দক্ষতা (Efficiency) আরও বৃদ্ধি করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যদি হয়রানির শিকার না হন এবং পণ্য খালাসে গতি আসে, তবে রাজস্ব আদায় এমনিতেই বাড়বে।” অন্যদিকে, চট্টগ্রাম কাস্টম এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম জানান, জায়গায় জায়গায় প্রশাসনিক বিড়ম্বনা ও যান্ত্রিক ত্রুটি নিরসন করা গেলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়।
কাস্টমসের আশাবাদ ও আগামীর পথ
বিরাজমান সংকট সত্ত্বেও হাল ছাড়ছেন না কাস্টমস কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানান, বর্তমানে রাজস্ব আদায়ে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। আমদানিকৃত পণ্যের গুণগত মান ও শুল্কায়নযোগ্য মূল্য (Assessable Value) বৃদ্ধির ফলে সামনের মাসগুলোতে রাজস্ব সংগ্রহ আরও বাড়বে বলে তারা আশাবাদী।
বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কেবল আমদানির ওপর নির্ভর করছে না, বরং কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরই নির্ভর করছে ২০২৬ সালের আগে এই ‘লাখ কোটি’র মাইলফলক স্পর্শ করার স্বপ্ন।