বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে আজ। দীর্ঘ ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে অবশেষে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই ঘটনাকে বাংলাদেশের গত সাড়ে পাঁচ দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং ‘অবিস্মরণীয়’ ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও সালাহউদ্দিন আহমদের প্রতিক্রিয়া
বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) লন্ডনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হিথ্রো বিমানবন্দর (Heathrow Airport) থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ উদযাপনে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এখন উৎসবের আমেজ। বৃহস্পতিবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে (VIP Lounge) প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
সেখানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সালাহউদ্দিন আহমদ তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “তারেক রহমান আজ নিজের মাতৃভূমিতে অবতরণ করবেন—এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতার ফেরা নয়, এটি দীর্ঘ ১৭-১৮ বছরের এক কষ্টকর নির্বাসিত (Exile) জীবনের অবসান। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত, সারা দেশবাসী অপেক্ষমাণ তাকে একনজর দেখার জন্য, তার কথা শোনার জন্য।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশের বিগত ৫৫ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ঘটনা আজকে ঘটতে যাচ্ছে। সারা দেশবাসী আজ সেটা দেখবেন, সারা বিশ্ববাসী দেখবেন। ইনশাআল্লাহ, আমরা এই মুহূর্তটিকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক (Historical Milestone) হিসেবে পালন করতে পারব।”
ফ্লাইট শিডিউল ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি প্রথম যাত্রাবিরতি দেয় সিলেটে। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টার ‘গ্রাউন্ড টার্নঅ্যারাউন্ড’ (Ground Turnaround) শেষে বিমানটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার রানওয়ে স্পর্শ করার কথা রয়েছে ড্রিমলাইনারটির। প্রিয় নেতাকে বরণ করে নিতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ রয়েছেন। তারেক রহমানের এই সফরকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দর ও সংলগ্ন এলাকায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাসিত জীবনের প্রেক্ষাপট: ২০০৭ থেকে ২০২৪
তারেক রহমানের এই দীর্ঘ বিদেশের দিনগুলো ছিল চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ে পূর্ণ। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর প্রেক্ষাপটে তাকে আটক করা হয়েছিল। প্রায় ১৮ মাস কারাবন্দী থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে পাড়ি জমান তিনি।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও একের পর এক মামলা তার দেশে ফেরার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সুদূর লন্ডন থেকেই তিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত থেকেছেন তৃণমূলের সাথে। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে পা রাখছেন তিনি।
উৎসবমুখর ঢাকা ও পরবর্তী কর্মসূচি
তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে ঢাকার রাজপথ এখন ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে তার গন্তব্যস্থল পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মীর ঢল নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলীয় সূত্র মতে, দেশে ফেরার পর তিনি প্রথমে তার অসুস্থ মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যাবেন। সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষায়, এই ফেরা কেবল একজন ব্যক্তির প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত।