গ্ল্যামার জগতের চিরন্তন নিয়ম হলো সুন্দর মুখচ্ছবি। কিন্তু সেই গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডেই যদি কারো কাজ পাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তার ‘অতিরিক্ত সুন্দর চেহারা’, তবে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। অবিশ্বাস্য শোনালেও বলিউডের বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা অভিনেত্রী কৃতি শ্যাননের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছিল। এক সময় যাকে ‘বেশি সুন্দর’ তকমা দিয়ে চরিত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আজ সেই কৃতিই নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি কেবল একটি সুন্দর মুখ নন, বরং এক শক্তিশালী পারফর্মার।
প্রত্যাখ্যানের সেই অদ্ভুত কারণ
সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন কৃতি। তিনি জানান, শুরুর দিকে বহুবার তাকে রিজেকশন (Rejection) এর সম্মুখীন হতে হয়েছে। এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে অভিনেত্রী বলেন, "স্ট্রাগলের দিনগুলোতে অনেক রাত আমি হতাশায় কেঁদেছি। কেউ কেউ আমাকে মুখের ওপর বলতেন— ‘তুমি বেশি সুন্দর’। পর্দায় কোনো চরিত্রকে বাস্তবসম্মত বা রিয়েলিস্টিক (Realistic) দেখাতে হলে নাকি চেহারার মধ্যে কিছু অসম্পূর্ণতা থাকা প্রয়োজন। আমার নিখুঁত সৌন্দর্যই তখন আমার অভিনয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।"
ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে রূপালি পর্দা: এক স্বপ্নযাত্রার শুরু
দিল্লির এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া কৃতির ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল আর দশটা সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীর মতো। তিনি ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি বিভাগের একজন কৃতী ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রী। কিন্তু মনের গহীনে ছিল অভিনয়ের প্রবল ইচ্ছা। সেই স্বপ্ন তাড়া করেই ২০১৪ সালে ‘হিরোপন্তি’ (Heropanti) ছবির মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক (Debut) ঘটে তার। অভিনেতা টাইগার শ্রফের বিপরীতে তার সপ্রতিভ উপস্থিতি প্রথম ছবিতেই দর্শকদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়।
‘মিমি’ এবং জাতীয় পুরস্কারের মুকুট
কৃতির ক্যারিয়ারের গ্রাফ কেবল বাণিজ্যিক ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘বেরেলি কি বরফি’, ‘লুকা ছুপি’ বা ‘হাউসফুল ৪’-এর মতো হিট ছবি দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজের অভিনয় সত্তাকে ভেঙেছেন বারবার। তবে ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মিমি’ (Mimi) ছবিটি তার ক্যারিয়ারে গেম চেঞ্জার (Game Changer) হিসেবে আবির্ভূত হয়। একজন ‘সারোগেট মাদার’ (Surrogate Mother) এর চরিত্রে তার আবেগী ও পরিপক্ক অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। এই অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেন ভারতের সম্মানজনক ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’ (National Film Award), যা তাকে বলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রীদের কাতারে পাকাপোক্ত জায়গা করে দেয়।
ব্র্যান্ড ভ্যালু ও আকাশছোঁয়া সম্পদ
কেবল অভিনয় নয়, ব্যবসায়িক বুদ্ধিতেও কৃতি অনন্য। বর্তমানে বিজ্ঞাপনী চুক্তি (Endorsement) এবং অভিনয় মিলিয়ে তার মোট সম্পদের (Net Worth) পরিমাণ প্রায় ৮২ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১০ কোটি টাকা)। শাহরুখ খানের সঙ্গে ‘দিলওয়ালে’ ছবিতে অভিনয়ের পর থেকেই তার বাজারমূল্য (Market Value) উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে তিনি বড় পর্দার পাশাপাশি বিভিন্ন লাক্সারি ব্র্যান্ডের গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও কাজ করছেন।
আগামীর পথে: নতুন চ্যালেঞ্জ
সাফল্যের এই চূড়ায় দাঁড়িয়েও থামতে রাজি নন কৃতি। আগামীতে তাকে দেখা যাবে দক্ষিণী সুপারস্টার ধানুশের বিপরীতে ‘তেরে ইশ্ক মে’ ছবিতে। এক সময় যে সৌন্দর্যকে তার দুর্বলতা ভাবা হয়েছিল, আজ সেই আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রম দিয়েই তিনি বলিউডের ‘টপ টায়ার’ অভিনেত্রীদের একজন। কৃতির এই যাত্রা নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা যে, ধৈর্য আর মেধা থাকলে যেকোনো গৎবাঁধা ধারণা ভেঙে জয়ী হওয়া সম্ভব।