দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে এক রাজকীয় ও আবেগঘন পরিবেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচলে ‘৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে’ সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল গণসংবর্ধনায় (Mass Reception) লাখো জনতার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূলমন্ত্র ঘোষণা করেন। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বলেন, “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান (I have a plan)।”
মাটি ছুঁয়ে আবেগঘন সূচনা: ১৭ বছরের প্রতীক্ষার অবসান
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলে তৈরি হয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর প্রিয় জন্মভূমির মাটিতে পা রেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই তিনি হাঁটু গেড়ে মাটির ওপর বসে পড়েন এবং পরম মমতায় দুই হাত দিয়ে দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখেন। এই দৃশ্য উপস্থিত হাজারো নেতাকর্মীকে অশ্রুসিক্ত করে তোলে।
বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান। স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কোলাকুলির মাধ্যমে তৈরি হয় এক আবেগঘন পুনর্মিলনী।
মার্টিন লুথার কিং থেকে তারেক রহমান: স্বপ্নের বদলে এখন ‘পরিকল্পনা’
বিকেলে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান তাঁর বক্তৃতায় বিশ্বখ্যাত বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক ভাষণের সূত্র টানেন। তিনি বলেন, “মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন—আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম (আমার একটি স্বপ্ন আছে)। তেমনি আজ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে আমিও বলছি—আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)। আর সেই প্ল্যানটা হলো বাংলাদেশকে নিয়ে, বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই পরিকল্পনা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য। দেশ পুনর্গঠনে এই সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ (Roadmap) বাস্তবায়নে তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা কামনা করেন।
নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ভিশন
বক্তৃতায় একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যা একজন মা স্বপ্ন দেখেন। আমরা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে একজন মানুষ নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারবে এবং কর্মস্থল বা কাজ শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।”
তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে তাঁর এই বক্তব্য জাতীয় ঐক্যের এক জোরালো বার্তা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
লাল-সবুজ বাসে যাত্রা ও জনসমুদ্রের গর্জন
বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমান যখন ‘বাংলাদেশ’ লেখা একটি বিশেষ লাল-সবুজ বুলেটপ্রুফ বাসে চড়ে সভাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন রাস্তার দুপাশে মানুষের ঢল নামে। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে তিনি সভামঞ্চে পৌঁছালে পুরো এলাকা গগনবিদারী স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। নজিরবিহীন এই জনসমাগম সামলাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়। এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন কয়েক কিলোমিটার এলাকা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল মানুষের চাপে।
বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে তারেক রহমান দলমত নির্বিশেষে একটি স্বৈরাচারমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে দেশের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ও বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।