সারাদেশে বইছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। হাড়কাঁপানো শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে রাজধানী ঢাকার বাতাসে বাড়ছে বিষাক্ত ধূলিকণা ও ধোঁয়াশা। শুষ্ক আবহাওয়া আর ক্রমবর্ধমান দূষণে মেগাসিটি ঢাকার বায়ুমান আবারও পৌঁছেছে চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে। আজ শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের (IQAir) তথ্যানুযায়ী, দূষিত শহরের বৈশ্বিক তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে ঢাকা। এদিন সকালে ঢাকার বায়ুমান সূচক বা Air Quality Index (AQI) রেকর্ড করা হয়েছে ২৮৭, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: লাহোর ও দিল্লির শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি
শুক্রবার সকাল ১০টার আপডেট অনুযায়ী, ৩৩৫ স্কোর নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর। প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজধানী দিল্লি ৩৩০ স্কোর নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই তিনটি শহরই বর্তমানে চরম বায়ুদূষণ বা Environmental Crisis-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ভারতের কলকাতা (২৩০) ও কাতারের রাজধানী দোহা (২১২) যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালে বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের স্তর নিচে নেমে আসায় ধূলিকণা ও ধোঁয়া দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে, যা দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
AQI সূচক ও ঢাকার অবস্থান
বায়ুমান বিশেষজ্ঞরা একিউআই স্কোরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিরূপণ করেন। সাধারণত স্কোর শূন্য থেকে ৫০ হলে বাতাস ‘ভালো’ এবং ৫১ থেকে ১০০ হলে ‘মাঝারি’ ধরা হয়। তবে স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ এবং ২০১ থেকে ৩০০ স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ (Very Unhealthy) বলা হয়। ঢাকা আজ এই ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। যদি কোনো শহরের স্কোর ৩০১ অতিক্রম করে, তবে তাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘Hazardous’ ঘোষণা করা হয়, যা বর্তমানে লাহোর ও দিল্লির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ও জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা
ঢাকার বাতাসের এই চরম অবনতি নাগরিকদের জন্য এক ভয়াবহ Health Risk বা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। চিকিৎসকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বাতাসে পিএম ২.৫ (PM 2.5)-এর মতো সূক্ষ্ম কণার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা সরাসরি ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে মিশে হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষ Health Alert জারি করা হয়েছে। এই সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য বাড়ির বাইরে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করার এবং জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে মানসম্মত মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাধারণ নাগরিকদেরও ঘরের বাইরের অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কেন বাড়ছে দূষণ?
শীতকালীন শুষ্ক আবহাওয়ায় বৃষ্টিপাত না থাকায় বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা দীর্ঘ সময় ভাসমান থাকে। ঢাকার ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কাজ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং আশপাশের ইটভাটার নিঃসরণ এই দূষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে এই Megacity বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন পরিবেশবাদীরা।