• দেশজুড়ে
  • বনদস্যু আতঙ্কে পেশা বদল সুন্দরবনের হাজারো বনজীবীর: কমেছে সরকারি রাজস্বও

বনদস্যু আতঙ্কে পেশা বদল সুন্দরবনের হাজারো বনজীবীর: কমেছে সরকারি রাজস্বও

জীবনের ঝুঁকি, মুক্তিপণ আদায় ও অপহরণের ঘটনায় বনজীবীরা বাধ্য হচ্ছেন বিকল্প জীবিকার সন্ধানে। আবার সক্রিয় পুরোনো দস্যু বাহিনীগুলো।

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
বনদস্যু আতঙ্কে পেশা বদল সুন্দরবনের হাজারো বনজীবীর: কমেছে সরকারি রাজস্বও

দস্যু আতঙ্ক, প্রাণহানির ভয় এবং অনিশ্চিত জীবনের কারণে সুন্দরবনের হাজারো বনজীবী তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় যারা বনের গভীরে প্রবেশ করে মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা, কাঁকড়া ও গোলপাতা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বনদস্যুদের উৎপাত ও নির্মম নির্যাতনের কারণে তাদের জীবিকা এখন মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে জীবনের নিরাপত্তা খুঁজতে তারা এখন ইটভাটা বা দিনমজুরির মতো বিকল্প জীবিকার দিকে ঝুঁকছেন।

জীবিকা ছেড়ে ঢাকামুখী বনজীবীরা

বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের দুর্বিষহ জীবনের চিত্র। ছোটবেলা থেকে সুন্দরবনে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসা জেলে রায়হান শেখ বনদস্যু আতঙ্কে এখন আর বনে যান না। এলাকায় কাজ না পেয়ে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা শহরে। মোবাইলে তিনি জানান, “জীবনের অর্ধেক সময় পার করেছি বনে মাছ ধরে। কিন্তু বনদস্যুর ভয়ে পেশা ছেড়ে ঢাকা শহরে একটি ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের কাজ করে কোনো মতে দিন পার করছি।”

কয়রা বাসস্ট্যান্ডে দেখা হওয়া বনজীবী সাফিদুল ইসলাম জানান, দস্যুদের মুক্তিপণ দিয়ে যে অর্থ আসে তাতে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। তাই বাধ্য হয়ে তিনি এখন নড়াইলে দিনমজুরি হিসেবে ধান কাটার কাজে যাচ্ছেন। আরেক বনজীবী আব্দুল জলিল (ছদ্মনাম) বলেন, “বনে গেলে জানি না বেঁচে ফিরব কি না। দস্যুরা বন্দুক ঠেকিয়ে টাকা চায়, না দিলে বেদম মারে, অপহরণ করে। একবার মুক্তিপণ দেওয়ার পর আর বনে যাই না। এখন ইট ভাটায় কাজ করি।”

মুক্তিপণ না দিলে নির্মম নির্যাতন

সাম্প্রতিক সময়ে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করতে যাওয়া দুই বনজীবী আ. সালাম ও আকবর আলী বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে আটক হয়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন আছেন।

ভুক্তভোগী আকবর জানান, আগে থেকে দস্যুদের চাওয়া অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করেও তিনি মারধরের শিকার হন। তার কোমরেসহ সারা শরীরে লাঠি দিয়ে প্রচুর পেটানো হয়, যার ফলে একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারান। একদিন পর তার সহকর্মীরা আরও মুক্তিপণ দিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

আরেক ভুক্তভোগী আ. সালাম একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর, রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নৌকা থেকে পালিয়ে বনের গহিনে চলে আসেন। শরীরের তীব্র ব্যথা ও পেটে ক্ষুধা নিয়ে রাতভর হেঁটে পরের দিন সন্ধ্যায় একটি ফরেস্ট ক্যাম্পে এসে পৌঁছান। প্রথমে তাকে দস্যু ভেবে আশ্রয় দিতে না চাইলেও, পরে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ায় বনকর্মীরা তাকে আশ্রয় দেন এবং পরবর্তীতে তার স্বজনেরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান।

আবার সক্রিয় একাধিক দস্যু বাহিনী

সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা, দাকোপ ও শ্যামনগর এলাকায় ঘুরে বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর জেল থেকে পালিয়ে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে দস্যুরা আবারও সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে এবং বনজীবীদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করছে। গত এক বছরে শতাধিক জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করেছে দস্যুরা এবং টাকা আদায়ের জন্য জিম্মি ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনও চালিয়েছে।

ভুক্তভোগী জেলেরা জানান, আত্মসমর্পণকারী অনেক বাহিনী আবার দস্যুতায় ফিরেছে। বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবনে মজনু বাহিনী, শরীফ বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবিউল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী, মাসুম বিল্লাহ ভাগনে বাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের ঘোষণা ও বর্তমান বাস্তবতা

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিল। এরপর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন।

বনদস্যুতার উৎপাতে জেলেরা এখন আগের মতো বনে মাছ-কাঁকড়া ধরতে যাচ্ছে না। পেশা বদলের কারণে বন থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় অর্ধেকেরও বেশি কমে এসেছে। গত ১ মাসে সুন্দরবনের চারটি স্টেশন থেকে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম পাশ নিয়ে জেলেরা বনে প্রবেশ করেছে।

বিকল্প জীবিকার স্থায়ী ব্যবস্থা সময়ের দাবি

কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ.ব.ম আব্দুল মালেক মন্তব্য করেন, দস্যু দমন ও নিরাপদ জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি না হলে এই জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়বে। তিনি সরকার ও এনজিওদের সমন্বিত উদ্যোগে তাদের জন্য বিকল্প জীবিকার স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান, যা বর্তমানে সময়ের দাবি।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ কালবেলাকে জানান, জেলে অপহরণের ঘটনা শোনা যাচ্ছে এবং মাঝে মাঝে বনকর্মীদের সঙ্গে দস্যুদের গোলাগুলিও হচ্ছে। তিনি বলেন, বন বিভাগের একার পক্ষে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। দ্রুত র‍্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবির অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান শুরু করা হবে।

Tags: bangladesh khulna division revenue loss sundarbans forest criminals pirate attacks fisherman abduction livelihood change