বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে এক নজিরবিহীন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড, ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনে উগ্রপন্থীদের হামলা এবং দুই দেশের হাইকমিশনারদের পাল্টাপাল্টি তলব—সব মিলিয়ে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের (Geopolitical Crisis) নেপথ্যে ভারতের ‘বড় ভাইসুলভ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ’ (Big Brotherly Arrogance) কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডন’। পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি বজায় রাখতে প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্বের (Sovereignty) প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘনীভূত হচ্ছে কূটনৈতিক সংকট: দ্য ডনের বিশ্লেষণ
‘দ্য ডন’-এর সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন এক মারাত্মক অস্থির সময় পার করছে। এই অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে প্রখ্যাত ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড। হাদির সমর্থক ও সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারতের ইন্ধন থাকতে পারে। এই সন্দেহের আগুন আরও উসকে দিয়েছে দিল্লির কূটনৈতিক মিশনে (Diplomatic Mission) হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীদের হামলার চেষ্টা। ভারতের কয়েকটি শহরে বাংলাদেশি মিশনের ওপর হামলা ও জাতীয় পতাকার অবমাননা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিশনের ওপর হামলা ও সাম্প্রদায়িক উত্তজনা
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ভারতের কিছু উগ্রবাদী সংগঠন, বিশেষ করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়াচ্ছে। ময়মনসিংহে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের মিশনগুলোর ওপর চালানো হামলাগুলোকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘ছোট ঘটনা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। অথচ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের শীর্ষ কূটনীতিককে প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ঢাকা ও দিল্লি উভয় পক্ষই একে অপরের দূতকে তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ফাটলকেই নির্দেশ করে।
হাসিনার আশ্রয় ও ভারতবিরোধী মনোভাবের নেপথ্য
শেখ হাসিনা ওয়াজেদের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকা ও দিল্লি প্রায় একই সুরে কথা বলেছে। ‘দ্য ডন’ বলছে, ওই সময়ে দিল্লি শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে গিয়েছিল, যা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি এক ধরনের ক্ষোভের জন্ম দেয়। গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় সেই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তিও বর্তমানে ভারতেই অবস্থান করছেন। এই ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের নীতি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে দিল্লির দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব
সম্পাদকীয়তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সৌহার্দ্য টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানো অপরিহার্য। দিল্লির উচিত হাদির হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে ঢাকাকে পূর্ণ সহযোগিতা করা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা। ভারতের ‘আঞ্চলিক প্রভু’ (Regional Power) হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা যদি প্রতিবেশীদের মধ্যে ভয়-ভীতি তৈরি করে, তবে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো বন্ধ করে প্রকৃত প্রতিবেশীর মতো আচরণ করাই হবে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
পরিশেষে, দ্য ডনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো দেশই যেন নিজেকে অন্য সবার ঊর্ধ্বে মনে না করে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বরফ গলানো সম্ভব।