আলুর রেকর্ড উৎপাদন এবং বাজারের চিত্র চলতি বছর বাংলাদেশে আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষিখাতে এটি সাফল্যের পরিবর্তে উল্টো চিত্র সৃষ্টি করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে দেশে ১.১৫ কোটি টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছিল মাত্র ৯০ লক্ষ টন। এই বিশাল ২০ লাখ টনেরও বেশি উদ্বৃত্ত আলু পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে, যার ফলস্বরূপ দাম নেমে এসেছে তলানিতে।
হিমাগারে আলুর পাহাড়, ভাড়া টানতে পারছেন না কৃষক রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সময় শেষ হলেও এখনও বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রিত রয়ে গেছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানান, বাজারদর কোল্ড স্টোরেজ ভাড়ার চেয়েও কম হওয়ায় কৃষকরা আলু তুলতে আসছেন না। বর্তমানে হিমাগারে সংরক্ষিত শুকনা আলু ৫-৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, অথচ হিমাগারের ভাড়া কেজি প্রতি ৬.৭৫ টাকা। লোকসানের ভয়ে অনেক কৃষক হিমাগার থেকে আলু তুলতেই যাচ্ছেন না, ফলে হিমাগার মালিকরাও প্রায় ২৫ কোটি টাকা ভাড়া বাবদ এবং অন্যান্য খাতে আরও ২৫ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন। রাজশাহীর তানোরের এক ব্যবসায়ী জানান, এক বস্তা আলুর ভাড়া ৪৫০ টাকা হলেও বাজারে এক বস্তা আলুর দাম মাত্র ২০০ টাকা।
নতুন আলুর দাম উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম হিমাগারে পুরনো আলুর বিপুল মজুদ থাকায় বাজারে নতুন আগাম আলুর দামও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কৃষকরা জানান, সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আগাম আলুর ভালো দাম পাওয়া যায়। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে নতুন আগাম জাতের আলু প্রতি কেজি মাত্র ১০-১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে কৃষকদের উৎপাদন খরচ পড়েছে কেজি প্রতি ২০-২৫ টাকা। সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার আগাম আলুর উৎপাদন খরচ গতবারের চেয়ে বেড়ে গেছে। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার এক কৃষক জানান, ২২ টাকা খরচ করেও তিনি আলু মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। রংপুর ও নীলফামারী জেলায় পরিস্থিতি আরও শোচনীয়; সেখানে প্রতি কেজি আলু ৭-১০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় অনেক চাষী আলুকে গরুর খাবার (পশুখাদ্য) হিসেবে ব্যবহার করছেন।
সরকারী হস্তক্ষেপের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি চাষিদের অভিযোগ, আলু ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। গত আগস্টে সরকার হিমাগার পর্যায়ে আলুর সর্বনিম্ন মূল্য প্রতি কেজি ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়নি। এছাড়া বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের ৫০ হাজার টন আলু সংগ্রহের পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, 'খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি' হয়ে গেছে, অর্থাৎ ফসলের বাজারমূল্য হিমাগারের ভাড়ার চেয়েও কম। তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে লোকসান হতে থাকলে আগামী মৌসুমে কৃষকরা আলু চাষ কমিয়ে দিতে পারেন, যা ভবিষ্যতে বাজারে আলুর তীব্র সংকট এবং দাম বৃদ্ধির অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এটি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।