ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের আবহে এবার সরাসরি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বাসভবনকে লক্ষ্যবস্তু করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছে মস্কো। ক্রেমলিনের দাবি, উত্তর রাশিয়ায় পুতিনের অন্যতম প্রিয় একটি বাসভবন লক্ষ্য করে ইউক্রেন বড় ধরনের ড্রোন হামলা (Drone Attack) চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে রাশিয়ার এই অভিযোগকে শুরুতেই ‘মিথ্যাচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে কিয়েভ। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে চলমান ‘Peace Talks’ বা শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মস্কোর অভিযোগ ও ল্যাভরভের হুঁশিয়ারি
লন্ডন ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ সোমবার (২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫) এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আনেন। ল্যাভরভ দাবি করেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী উত্তর রাশিয়ায় পুতিনের ঐতিহাসিক বাসভবন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তিনি এই ঘটনাকে ‘State Terrorism’ বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হিসেবে আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দেন যে, এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত জবাব না দিয়ে রাশিয়া ছাড়বে না।
ল্যাভরভ আরও জানান, শান্তি আলোচনার মধ্যেই এমন উসকানিমূলক হামলার কারণে রাশিয়া তাদের আলোচনার শর্ত ও অবস্থান পুনরায় মূল্যায়ন (Reconsideration) করতে বাধ্য হবে।
৯১টি ড্রোন ও নভগোরদ পরিস্থিতি
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, রোববার (২৮ ডিসেম্বর) রাতে নভগোরদ (Novgorod) অঞ্চলে প্রেসিডেন্টের ওই বাসভবন লক্ষ্য করে অন্তত ৯১টি দূরপাল্লার ড্রোন ছোড়া হয়। তবে রাশিয়ার আধুনিক ‘Air Defense System’ বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকায় সবকটি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। ক্রেমলিনের দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনায় কোনো হতাহত কিংবা বাসভবনের কোনো অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
জেলেনস্কির পাল্টা অভিযোগ: ‘হামলার অজুহাত খুঁজছে মস্কো’
রাশিয়ার এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এটি মস্কোর একটি পূর্বপরিকল্পিত ‘Propaganda’। জেলেনস্কির মতে, কিয়েভের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও ‘Strategic’ স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালানোর একটি পটভূমি বা অজুহাত তৈরি করতেই রাশিয়া এমন নাটক সাজাচ্ছে। তিনি আরও মনে করেন, চলমান শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করার জন্যই পুতিন প্রশাসন এই ড্রোনের গল্প বাজারে ছেড়েছে।
‘দোলগিয়ে বোরোদি’: ঐতিহ্যের লক্ষ্যবস্তু
যে বাসভবনটি ঘিরে এই উত্তজনা, তার নাম ‘দোলগিয়ে বোরোদি’ (Dolgiye Borody), যার অর্থ ‘লং বিয়ার্ডস’ বা দীর্ঘ দাড়ি। ঐতিহাসিক এই বাসভবনটি রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় এটি জোসেফ স্টালিন, নিকিতা ক্রুশ্চেভ ও বরিস ইয়েলৎসিনের মতো শাসকরা ব্যবহার করতেন। হামলার সময় প্রেসিডেন্ট পুতিন সেখানে অবস্থান করছিলেন কি না, সে বিষয়ে ক্রেমলিন থেকে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
জাপোরিঝিয়া ফ্রন্টে পুতিনের নতুন নির্দেশ
ড্রোন হামলার এই বিতর্কের মধ্যেই রণক্ষেত্রে রুশ সামরিক তৎপরতা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন পুতিন। সোমবার তিনি তার বাহিনীকে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝিয়া (Zaporizhzhia) অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আদেশ দেন। রুশ সামরিক কমান্ডারের দাবি অনুযায়ী, মস্কোর বাহিনী বর্তমানে জাপোরিঝিয়ার বৃহত্তম শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের অভিযান শুরু হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ড্রোন হামলার অভিযোগ আর অন্যদিকে জাপোরিঝিয়া দখলের নির্দেশ—সব মিলিয়ে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ফলে যুদ্ধবিরতির যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা আবারও ফিকে হয়ে যেতে পারে।