বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামমুখর অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) থেকে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক (State Mourning)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এই শোক পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় শোক ও সরকারি নির্দেশনা
মঙ্গলবার রাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ স্বাক্ষরিত এক সরকারি গেজেটে (Gazette) জানানো হয়েছে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার অবিস্মরণীয় অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বুধবার থেকে শুক্রবার (৩১ ডিসেম্বর, ১ ও ২ জানুয়ারি) পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে।
এই তিন দিন বাংলাদেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সকল সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত (National Flag at Half-mast) রাখা হবে। বিদেশের মাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও একই প্রটোকল (Protocol) মেনে শোক পালন করা হবে।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজার ঐতিহাসিক প্রস্তুতি
প্রশাসন ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জানাজার জন্য রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউকে বেছে নেওয়া হয়েছে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার পরিবর্তে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে তাঁর কফিন রাখা হবে। বুধবার দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিতব্য এই জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের চত্বর এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউজুড়ে জানাজার কাতার বিন্যাসের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জানাজা শেষে তাঁকে চন্দ্রিমা উদ্যানে স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে।
বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনা
আগামী শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় বাংলাদেশের সকল মসজিদে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। একই সাথে মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে তাঁর আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এই শোক পালনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার পরিসমাপ্তি
মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনৈতিক মহল থেকে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাজীবন, শারীরিক অসুস্থতা এবং গণতন্ত্রের (Democracy) প্রতি তাঁর অনড় অবস্থানের কথা স্মরণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির একটি স্তম্ভের পতন। রাষ্ট্রীয় এই শোক পালনের মধ্য দিয়ে দেশ তাঁর অবদানের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করছে।