বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তার এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা NEIR সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ চালুর মাধ্যমে। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) অবৈধ ও আন-অফিশিয়াল হ্যান্ডসেট বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে এই নতুন ব্যবস্থার ফলে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—মালিকানা হস্তান্তর। আপনি যদি আপনার ব্যবহৃত নিবন্ধিত মোবাইল ফোনটি বিক্রি করতে চান বা কাউকে উপহার হিসেবে দিতে চান, তবে অবশ্যই সেটি ‘ডি-রেজিস্ট্রেশন’ (De-registration) করতে হবে। অন্যথায়, আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে নিবন্ধিত হ্যান্ডসেটটি অপব্যবহার হলে তার দায়ভার আপনার ওপরই বর্তাবে।
কেন এই ডি-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া?
একটি স্মার্টফোন যখন এনইআইআর ডাটা সেন্টার (Data Center)-এ নিবন্ধিত হয়, তখন সেটি নির্দিষ্ট গ্রাহকের এনআইডি (NID) এবং সিম কার্ডের সঙ্গে ট্যাগ হয়ে যায়। দেশের ‘Tech Ecosystem’ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিটিআরসি এই ব্যবস্থা নিয়েছে। আপনি ফোনটি হস্তান্তর করার আগে যদি ডাটাবেজ থেকে আপনার তথ্য সরিয়ে না ফেলেন, তবে পরবর্তী ব্যবহারকারী সেটি নিজের নামে সচল করতে পারবেন না। মূলত ‘Market Value’ রক্ষা এবং চোরাই ফোনের কারবার বন্ধ করতেই এই কঠোর নিয়ম।
ডি-রেজিস্ট্রেশনের আগে যা প্রয়োজন
ডি-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু করার আগে গ্রাহককে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে: ১. হ্যান্ডসেটটিতে অবশ্যই এমন একটি সিম কার্ড সচল থাকতে হবে, যা গ্রাহকের নিজস্ব এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত। ২. গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) শেষ চারটি ডিজিট সংগ্রহে রাখতে হবে।
মালিকানা হস্তান্তরের সহজ পদ্ধতিসমূহ
বিটিআরসি গ্রাহকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে অনলাইন এবং অফলাইন—উভয় মাধ্যমেই ডি-রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ রেখেছে।
১. এনইআইআর পোর্টালের মাধ্যমে (অনলাইন পদ্ধতি):
ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।
প্রথমে এনইআইআর-এর অফিসিয়াল পোর্টালে লগ-ইন করতে হবে।
আপনার ব্যক্তিগত ড্যাশবোর্ডে গিয়ে ‘Registered Devices’ তালিকাটি দেখুন।
সেখান থেকে যে হ্যান্ডসেটটি হস্তান্তর করতে চান, সেটি নির্বাচন করুন।
এরপর ‘ডি-রেজিস্টার’ (De-register) বাটনে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও এনআইডি ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করলেই ফোনটি উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
২. ইউএসএসডি (USSD) কোডের মাধ্যমে (অফলাইন পদ্ধতি):
স্মার্টফোন ছাড়াও সাধারণ ফিচার ফোনের মাধ্যমেও এই সেবা পাওয়া যাবে।
ফোনের ডায়াল প্যাডে গিয়ে *১৬১৬১# টাইপ করে কল করুন।
স্ক্রিনে আসা অপশনগুলো থেকে ‘De-registration’ নির্বাচন করুন।
পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করে আপনার এনআইডি ও আইএমইআই (IMEI) সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করলে প্রক্রিয়াটি সফল হবে।
ক্লোন বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই-এর ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম
বর্তমান বাজারে কিছু ক্লোন বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই যুক্ত হ্যান্ডসেট পাওয়া যায়। এ ধরনের হ্যান্ডসেট ডি-রেজিস্ট্রেশন করার ক্ষেত্রে বিটিআরসি বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখেছে। এক্ষেত্রে বর্তমান গ্রাহককে অতিরিক্ত তথ্য হিসেবে পরবর্তী ব্যবহারকারীর সিম নম্বরটি প্রদান করতে হবে। এটি মূলত ডিভাইসের অপব্যবহার রোধে একটি ট্র্যাকিং মেকানিজম হিসেবে কাজ করবে।
টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন শৃঙ্খলা
উল্লেখ্য যে, গত ১৬ ডিসেম্বর এই সিস্টেম চালুর কথা থাকলেও মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের অনুরোধে এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এটি কার্যকর করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে স্থানীয় মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে ‘Job Creation’ বা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রে-মার্কেটের দৌরাত্ম্য কমবে। গ্রাহকদের প্রতি বিটিআরসি-র পরামর্শ, এখন থেকে যেকোনো হ্যান্ডসেট কেনার সময় তা অফিশিয়াল কি না তা যাচাই করুন এবং বিক্রির সময় অবশ্যই ডি-রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করুন।