মাঠের পারফরম্যান্সে আলবিসেলেস্তেরা এখন বিশ্বসেরা। লিওনেল মেসির জাদুকরী ছোঁয়ায় একের পর এক ট্রফি আসছে আর্জেন্টিনার ঘরে। কিন্তু ঠিক যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির চূড়ান্ত লগ্নে দাঁড়িয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা, তখনই মাঠের বাইরের এক অন্ধকার জগতের বীভৎস চিত্র সামনে এল। কর ফাঁকি (Tax Evasion), ম্যাচ গড়াপেটা (Match-fixing) এবং ভয়াবহ অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে বড় ধরনের আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (AFA) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া এবং কোষাধ্যক্ষ পাবলো তোভিগিনো।
তেভেজের সেই বিস্ফোরক ভিডিও ও রহস্যময় ভিলা
এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের মার্চে। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার কার্লোস তেভেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে বুয়েনস আইরেসের শহরতলি পিলারের একটি রহস্যময় বাড়িতে এএফএ কর্তাদের সন্দেহজনক গতিবিধির কথা জানান তিনি। অভিযোগ ওঠে, ওই ভিলার মাটির নিচে টাকার ব্যাগ পুঁতে রাখা হয়েছে এবং সেখানে অবৈধ সম্পদের পাহাড় জমানো হয়েছে। তেভেজের সেই অভিযোগের সূত্র ধরে নড়েচড়ে বসে দেশটির রাজনৈতিক দল ‘কোয়ালিশন সিভিক’ এবং শুরু হয় পুলিশি তদন্ত।
তদন্তে বেরিয়ে এল ‘অপরাধপুরী’র চিত্র
গোয়েন্দা পুলিশ ও আর্থিক অপরাধ দমন বিভাগের দীর্ঘ অনুসন্ধানে পিলারের সেই বাড়িটি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্তকারীদের মতে, এই ভিলাটি ছিল এএফএ-র যাবতীয় আর্থিক দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু বা ‘Hub’। তল্লাশিতে সেখানে একটি ব্যক্তিগত হেলিপোর্ট এবং ৫৪টি দামি ও দুষ্প্রাপ্য গাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দারা দাবি করছেন, এই বাড়িটি মূলত একটি ‘Money Laundering’ বা অর্থ পাচার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার দপ্তরে হানা দিয়ে গোয়েন্দারা বিপুল পরিমাণ নথি বাজেয়াপ্ত করেছেন, যা সরাসরি সভাপতি তাপিয়া ও কোষাধ্যক্ষ তোভিগিনোর অবৈধ লেনদেনের দিকে ইঙ্গিত করে।
১৩ মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতি ও ম্যাচ গড়াপেটার ছায়া
প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের জালিয়াতি করা হয়েছে, যার ফলে আর্জেন্টিনা সরকার বড় ধরনের রাজস্ব হারিয়েছে। তবে কেবল আর্থিক তছরুপই নয়, এই দুর্নীতির জাল বিস্তৃত হয়েছে ফুটবলের মাঠ পর্যন্ত। অভিযোগ উঠেছে, জালিয়াতি করা টাকার ভাগ বাটোয়ারা এবং বিভিন্ন ঘরোয়া লিগের ম্যাচ গড়াপেটা বা ‘Match-fixing’ নিয়ে পরিকল্পনা চলত এই গোপন ভিলাতেই। এই চক্রে আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকটি ক্লাবের নামও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ মিশনের আগে অশনি সংকেত
২০২৬ বিশ্বকাপের আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি। তার আগে আগামী মার্চে ফিনালিসিমায় (Finalissima) ইউরো জয়ী স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খোদ এএফএ সভাপতির বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত ও দুর্নীতির অভিযোগে দলের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এএফএ-র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে বিপাকে পড়েছেন শীর্ষ কর্তারা।
ক্ষুব্ধ সমর্থক ও জনরোষ
লিওনেল মেসি ও কোচ লিওনেল স্কালোনি যখন কঠোর পরিশ্রমে আর্জেন্টিনাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে গেছেন, তখন পর্দার আড়ালে কর্মকর্তাদের এমন কর্মকাণ্ডে ক্ষোভে ফুঁসছেন সমর্থকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই ডার্টি পলিটিক্স বা নোংরা রাজনীতির প্রভাব দলের ড্রেসিংরুম এবং বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সে পড়তে পারে।
আর্জেন্টিনার বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এই কলঙ্ক দূর করতে এবং স্বচ্ছতা (Transparency) ফিরিয়ে আনতে তদন্তে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের মহারণের আগে এই আইনি লড়াই মেসিদের মানসিকতায় কতটা প্রভাব ফেলে।