দেশের ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা, টিকিটের কৃত্রিম সংকট নিরসন এবং বিশেষ করে বিদেশগামী অভিবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ‘বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ সংশোধন করে নতুন একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যা দেশের এভিয়েশন ও পর্যটন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করেন। শুক্রবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়।
অনলাইন এজেন্সির জন্য এক কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি
নতুন অধ্যাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (OTA) এবং প্রথাগত অফলাইন এজেন্সির জন্য আলাদা আলাদা ব্যাংক গ্যারান্টির বিধান। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট বিক্রির সেবা দিতে চাইলে তাকে এক কোটি টাকা ‘Bank Guarantee’ জমা দিতে হবে। অন্যদিকে, অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সির ক্ষেত্রে এই গ্যারান্টির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। মূলত প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেই এই বড় অংকের আর্থিক জামানতের নিয়ম করা হয়েছে।
বন্ধ হচ্ছে ‘ফলস বুকিং’ ও বিটুবি ব্যবসা
টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অনিয়ম বন্ধে অধ্যাদেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এখন থেকে কোনো এজেন্সি ‘False Booking’ বা বানোয়াট আসন সংরক্ষণের মাধ্যমে টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারবে না। এছাড়া, কোনো ট্রাভেল এজেন্সি অন্য কোনো এজেন্সির কাছ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয় বা ‘B2B’ (Business-to-Business) লেনদেন করতে পারবে না। টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত বৈধ আর্থিক মাধ্যম বা ‘Official Payment Channel’ ছাড়া অন্য কোনোভাবে লেনদেন করা যাবে না।
অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা ও প্রতারণা রোধ
সাধারণ যাত্রী ও অভিবাসী কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় অধ্যাদেশে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো এজেন্সি মিথ্যা প্রলোভন, চটকদার বিজ্ঞাপন বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অগ্রিম অর্থ আদায় করতে পারবে না। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য তৃতীয় কোনো দেশ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয় এবং টিকিট নিশ্চিত হওয়ার পর যাত্রীর তথ্য (Information) পরিবর্তন করাকে এখন থেকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
কঠোর শাস্তির বিধান ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
আইন ভঙ্গকারীদের জন্য শাস্তির মাত্রা আগের চেয়ে কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। নতুন বিধানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা এজেন্সি এই আইনের লঙ্ঘন করলে তাকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাণ্ড অথবা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এছাড়া, বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা বা দুর্নীতি রোধে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর ‘Travel Ban’ বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতাও লাভ করেছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
ব্যবসায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নিবন্ধন নবায়নের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে প্রতি তিন বছর অন্তর ট্রাভেল এজেন্সির সনদ নবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট বা আর্থিক বিবরণীসহ সার্বিক কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি ‘Loan Defaulter’ বা ঋণ খেলাপি হন, তবে তিনি ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই অধ্যাদেশ বাস্তবায়িত হলে দেশের ট্রাভেল সেক্টরে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমবে এবং সাধারণ যাত্রীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে। বিশেষ করে ওটিএ (OTA) খাতের ডিজিটাল ডিসিপ্লিন নিশ্চিত করতে সরকারের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী।