আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নড়াইলের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। নির্বাচনের প্রাথমিক বাছাই পর্বেই বড় ধরনের রদবদল ঘটে গেল জেলাটিতে। নড়াইলের দুটি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্যে জমা দেওয়া ২৪ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে ১৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। শনিবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত যাচাই-বাছাই (Verification) প্রক্রিয়া শেষে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আবদুল সালাম এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান।
নড়াইল-১: নাটকীয়তা শেষে বৈধ ৫ প্রার্থী
নড়াইল সদর উপজেলার একাংশ ও কালিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নড়াইল-১ আসনে লড়াইয়ের চিত্রটি বেশ বৈচিত্র্যময়। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ওবায়দুল্লাহ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী মো. আব্দুর রহমানের মনোনয়নপত্র বৈধ (Valid) বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে এই আসনে বাছাই পর্বে কিছুটা নাটকীয়তা তৈরি হয়েছিল। জাতীয় পার্টির (JP) প্রার্থী মো. মিল্টন মোল্যার ফর্মে ত্রুটি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত কপির অভাব এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বি এম নগিব হোসেনের সরকারি চাকরি থেকে অবসরের প্রত্যয়নপত্র জমা না দেওয়ায় শুরুতে তাদের মনোনয়ন স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় দলিলাদি ও কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই সাপেক্ষে তাদের মনোনয়নও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বড় একটি অংশ নির্বাচনী মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল আজিজ এবং কর্নেল (অব.) এস কে এম সাজ্জাদ হোসেনসহ মোট ১০ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বিভিন্ন ত্রুটির কারণে বাতিল করা হয়েছে। এই তালিকায় আরও রয়েছেন সুকেশ সাহা আনন্দ, সাকিব হোসেন এবং মাহফুজা বেগমের মতো প্রার্থীরা।
নড়াইল-২: হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রস্তুতি, বাতিল ৩ মনোনয়ন
নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নড়াইল-২ আসনটি বরাবরই ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (NPP) সাবেক চেয়ারম্যান এ জেড এম ফরিদুজ্জামান (যিনি সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন) তাঁর মনোনয়ন টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এ ছাড়া জামায়াতের জেলা আমির মো. আতাউর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. তাজুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই আসনে খেলাফত মজলিসের আ. হান্নান সরকার ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মো. শোয়েব আলীও নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াইয়ে থাকছেন।
তবে এই আসন থেকেও ৩ জন প্রার্থীর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। জাতীয় পার্টির খন্দকার ফায়েকুজ্জামান, গণঅধিকার পরিষদের (GOP) মো. নূর ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদা ইয়াসমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
আপিল ও পরবর্তী নির্বাচনী প্রক্রিয়া
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আবদুল সালাম গণমাধ্যমকে জানান, তথ্যগত অমিল, সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশনের অভাবে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই ১৩ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তবে নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তারা দমে যাচ্ছেন না। রিটার্নিং কর্মকর্তার এই আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা আগামী ৫ জানুয়ারি থেকে ১১ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশনে (Election Commission) আপিল করার আইনি সুযোগ পাবেন।
নির্বাচন কমিশনের আপিল বিভাগের শুনানির পরেই নির্ধারিত হবে নড়াইলের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে শেষ পর্যন্ত কতজন প্রার্থী ব্যালট পেপারে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারছেন। আপাতত জেলাজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে—কার আপিল টিকবে আর কার কপাল পুড়বে।