লক্ষ্যমাত্রা ৮০ কোটি ইউনিট: ‘Gemini AI’-এর বৃহত্তর ব্যবহার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ক্ষেত্রে এক বিশাল এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্লোবাল টেক জায়ান্ট স্যামসাং। এই বছর প্রতিষ্ঠানটি তাদের বাজারে আনা এআই সুবিধাসম্পন্ন মোবাইল ডিভাইসের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করতে চলেছে। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস নির্মাতা এই সংস্থাটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, এই বছর তারা প্রায় ৮০ কোটি (৮০০ মিলিয়ন) ইউনিট এআই-চালিত ডিভাইস বাজারে আনবে। দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রযুক্তিনির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যের কথা রয়টার্স বার্তা সংস্থাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের সহ–প্রধান নির্বাহী (Co-CEO) টি এম রো।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিশাল সংখ্যক ডিভাইসে মূলতঃ গুগলের উন্নতমানের ‘Gemini AI’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট উভয় ক্যাটাগরির ডিভাইস অন্তর্ভুক্ত থাকবে। গত বছর পর্যন্ত স্যামসাংয়ের প্রায় ৪০ কোটি ডিভাইসে জেমিনি-চালিত এআই সুবিধা বিদ্যমান ছিল। ২০২৬ সালে সেই সংখ্যাকেই দ্বিগুণ করার এই মেগা-পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সংস্থাটি। নভেম্বরে সহ–প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সিদ্ধান্তগুলিই টি এম রো-এর প্রথম বড় রণনীতির ইঙ্গিত।
অ্যাপলের সঙ্গে শীর্ষস্থান দখলের লড়াই
স্যামসাংয়ের এই বিশাল পদক্ষেপ কেবল সংখ্যাবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পিছনে রয়েছে গভীর বাজার কৌশল। একসময় স্মার্টফোন মার্কেটে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল স্যামসাং। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অবস্থান ছিনিয়ে নিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপল। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর শীর্ষ স্মার্টফোন নির্মাতা ছিল অ্যাপল। এই অবস্থায়, এআই সুবিধাকেই মূল অস্ত্র হিসেবে দেখছে স্যামসাং। তারা মনে করছে, এআই ফিচার প্রদানের ক্ষেত্রে তারা অ্যাপলের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে থাকতে পারে, যা তাদের আবারও মার্কেট লিডার পজিশনে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
টি এম রো স্পষ্ট করেছেন, যত দ্রুত সম্ভব সংস্থার সমস্ত পণ্য, সমস্ত ফিচার এবং প্রতিটি সেবায় এআই প্রযুক্তিকে যুক্ত করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। মোবাইল ডিভাইস ছাড়াও স্যামসাংয়ের বিপুল সংখ্যক স্মার্ট টিভি এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিতেও (Home Appliances) এই অত্যাধুনিক এআই সেবা যুক্ত করা হবে। এই সমস্ত বিভাগের দায়িত্বেও রয়েছেন টি এম রো। এটি গুগলের জন্যও একটি ইতিবাচক দিক, কারণ ওপেনএআই-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে কঠিন এআই প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে গুগলও।
বাজারে বাড়ছে ‘Galaxy AI’-এর চাহিদা, কী বলছেন টি এম রো?
স্যামসাংয়ের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ জরিপ এই রণনীতির সাফল্যের প্রাথমিক ইঙ্গিত দিচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ‘গ্যালাক্সি এআই’ ব্র্যান্ডের পরিচিতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ এই ব্র্যান্ড সম্পর্কে অবগত ছিলেন, বর্তমানে তা বেড়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি প্রমাণ করে, গ্রাহকদের মধ্যে অত্যাধুনিক এআই সুবিধার প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
যদিও টি এম রো স্বীকার করেছেন যে, এআই প্রযুক্তি নিয়ে এখনও কিছু সংশয় (Skepticism) রয়েছে, তবে তিনি আশাবাদী। তাঁর মতে, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তি আরও বেশি পরিমাণে জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে এবং গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
চিপ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ
যদিও স্যামসাংয়ের এই মেগা-পরিকল্পনা একদিকে যেমন বাজার দখলের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor) তথা মেমোরি চিপের যে সংকট চলছে, তা স্যামসাংয়ের সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসার জন্য ইতিবাচক হলেও, এর ফলে স্মার্টফোন ব্যবসায় খরচের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। টি এম রো এই পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং জানিয়েছেন, কোনো কোম্পানিই এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এই বর্ধিত খরচের কারণে দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি। তবে, এই আর্থিক প্রভাব কমাতে স্যামসাং অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে তিনি জানান।