দীর্ঘ পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে দেশীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম দিকপাল তিনি। পর্দার ‘মাসুদ রানা’ খ্যাত এই কিংবদন্তি অভিনেতা কেবল রুপালি জগতেই নয়, বরং সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতেও বরাবরই স্পষ্টবাদী। তিনি মাসুদ পারভেজ, যাকে দর্শক সোহেল রানা হিসেবেই চেনে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগ (IPL) থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া এবং দেশের বাজারে ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা।
সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সমমর্যাদার দাবি
গত সোমবার (৫ জানুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক হ্যান্ডেল থেকে দেওয়া এক পোস্টে সোহেল রানা দুই দেশের গণমাধ্যম বা Broadcasting খাতের অসম প্রতিযোগিতার বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি দাবি করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভারতে প্রচারের সুযোগ না পাবে, ততক্ষণ বাংলাদেশেও ভারতীয় চ্যানেলের সম্প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা উচিত। সোহেল রানা মনে করেন, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে, যেখানে উভয় পক্ষই সমান সুযোগ পাবে।
সামাজিক বন্ধনে ‘বউ-শাশুড়ি’ নাটকের নেতিবাচক প্রভাব
ভারতীয় টেলিভিশন কন্টেন্টের মান ও তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন এই অভিনেতা। সোহেল রানা তার পোস্টে উল্লেখ করেন, ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত তথাকথিত ‘বউ-শাশুড়ির ঝগড়া’ কেন্দ্রিক নাটকগুলো আমাদের হাজার বছরের লালিত পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক বন্ধনকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মেগা সিরিয়ালগুলোর কন্টেন্ট অনেক ক্ষেত্রেই উগ্রতা ও নেতিবাচক পারিবারিক ষড়যন্ত্রকে উসকে দেয়। সোহেল রানা বিশ্বাস করেন, মানহীন এসব কন্টেন্ট আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা নষ্ট করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুস্তাফিজ ইস্যু ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নীতি
আইপিএলের আসন্ন আসরে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও, শেষ পর্যন্ত স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) আপত্তিতে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনাটি বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট প্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, মুস্তাফিজের মতো একজন বিশ্বমানের বোলারকে এভাবে ব্র্যাকেটবন্দি করা কেবল একজন খেলোয়াড়ের প্রতি অবিচার নয়, বরং এটি বড় ধরনের ‘স্পোর্টস পলিটিক্স’। সোহেল রানা এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হয়ে ভারতের বিনোদনমূলক কন্টেন্ট বয়কটের দাবিকে আরও জোরালো করেছেন।
শিল্পী সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ
মুস্তাফিজুর রহমানের প্রতি এমন আচরণের পর কেবল সোহেল রানাই নন, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনের আরও অনেক তারকা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এর আগে বর্তমান শিল্পী সমিতির সভাপতি ও বিশিষ্ট অভিনেতা মিশা সওদাগর সরাসরি ভারতকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। বাংলাদেশি তারকাদের এমন ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে, যা দেশীয় দর্শকের মধ্যেও জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
সোহেল রানার এই আহ্বান এবং বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কেবল ক্রিকেট মাঠেই নয়, বরং মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও ভারতের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালার দাবি জোরালো হচ্ছে। ডিজিটাল মিডিয়ার এই যুগে কন্টেন্ট সেন্সরশিপ বা চ্যানেল বন্ধের বিতর্ক আরও কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।