ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত ও নাটকীয়ভাবে আটক হওয়া প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। সোমবার (৫ জানুয়ারি) নিউ ইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে (Federal Court) মাদক-সন্ত্রাসবাদের (Narcoterrorism) গুরুতর অভিযোগে তাকে হাজির করা হলে তিনি কঠোর কণ্ঠে বলেন, তাকে তার নিজ দেশ থেকে ‘অপহরণ’ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে গ্রেফতার হওয়ার পর, এটিই ছিল আদালতের কাঠগড়ায় ৬৩ বছর বয়সী মাদুরোর প্রথম উপস্থিতি।
আদালতে নাটকীয় উপস্থিতি
সোমবার সকালে এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মাদুরোকে আদালতে আনা হয়। ব্রুকলিনের একটি ডিটেনশন সেন্টার (Detention Center) থেকে হাতকড়া পরা অবস্থায় তাকে এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে হেলিকপ্টারে করে ম্যানহাটনের আদালতের কাছে নিয়ে আসা হয়। এ সময় ‘ট্যাকটিক্যাল গিয়ার’ (Tactical Gear) পরিহিত সশস্ত্র কমান্ডোরা তাদের পাহারা দিচ্ছিলেন। ফেডারেল বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে মাদুরো সোজাসুজি বলেন, “আমি নির্দোষ, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমাকে ভেনেজুয়েলা থেকে অপহরণ করে এখানে আনা হয়েছে।”
গুরুতর সব অভিযোগ
মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রসিকিউটররা চারটি প্রধান ফৌজদারি অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি বিশাল কোকেন-পাচারকারী নেটওয়ার্ক বা ‘কার্টেল’ (Cartel) পরিচালনা করতেন। এই নেটওয়ার্কটি মেক্সিকোর কুখ্যাত সিনালোয়া ও জেটাস কার্টেল, কলম্বিয়ার ফার্ক (FARC) বিদ্রোহী এবং ভেনেজুয়েলার দুর্ধর্ষ ‘ট্রেন ডি আরাগুয়া’ গ্যাংয়ের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করত। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই মাদক ব্যবসার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ মাদুরো তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদে ব্যবহার করেছেন।
মাদুরোর আত্মপক্ষ সমর্থন ও তেলের রাজনীতি
দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরো এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। আদালতের শুনানিতে তিনি পুনরায় দাবি করেন যে, এই মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুদের (Oil Reserves) নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতেই এই ‘ষড়যন্ত্র’ লিপ্ত হয়েছে ওয়াশিংটন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় মেরুকরণ
এদিকে, মাদুরোকে আটকের এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। রাশিয়া, চীন এবং ভেনেজুয়েলার বামপন্থি মিত্র দেশগুলো এই মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার ভেতরেও উত্তেজনা চরমে। দেশটিতে বর্তমানে একটি জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। সোমবার প্রকাশিত একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, শনিবারের মার্কিন হামলাকে সমর্থনকারী যে কাউকেই বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেফতার করা হবে।
প্রেক্ষাপট: ট্রাম্পের ‘সারপ্রাইজ’ অভিযান
গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে ভেনেজুয়েলায় এক ঝটিকা সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন কমান্ডোরা। সেখান থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। হোয়াইট হাউজ এই অভিযানকে ‘ন্যায়বিচারের জয়’ হিসেবে অভিহিত করলেও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এর আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
বর্তমানে মাদুরোকে নিউইয়র্কের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে রাখা হয়েছে। এই হাই-প্রোফাইল মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব।